নিকলী থানার ওসির দক্ষতায় চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন,ঘাতক আটক
নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
দুই বছরের এক ভার্চুয়াল পরিচয়, ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিল গভীর ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসা গড়েছিল সংসার, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের আশ্বাস। কিন্তু সেই স্বপ্নই একসময় ভেঙে যায় নির্মম বাস্তবতায়—সন্দেহ, অবিশ্বাস আর অন্ধ আবেগের কাছে হার মানে ভালোবাসা, আর জন্ম নেয় এক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড।
প্রায় দুই বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে পরিচয় হয় রাজশাহী জেলার বাঘমারা থানার ভবানীগঞ্জ গ্রামের আঃ রশিদের মেয়ে খেয়া আক্তারের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ভাটিবরাটিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের মোঃ ফরিদ উদ্দিনের ছেলে মাহমুদুল হাসান রিয়ানের। শুরুটা ছিল সাধারণ—মেসেজ, কথোপকথন, তারপর ধীরে ধীরে ভালো লাগা, আর সেই ভালো লাগা একসময় গভীর প্রেমে রূপ নেয়।
ভালোবাসার টানে এ বছরের ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে খেয়া আক্তার নিজ বাড়ি ছেড়ে ছুটে আসেন রিয়ানের কাছে। সামাজিক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ১৯ জানুয়ারি তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নতুন সংসার শুরু হয় ভালোবাসা, বিশ্বাস আর স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে।
কিন্তু সুখের সেই সংসারের আড়ালেই নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছিল সন্দেহের কালো ছায়া।
রিয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবির হাসান—একই গ্রামের বাসিন্দা, শৈশবের সঙ্গী, বিশ্বাসের মানুষ। প্রায়ই রিয়ানের বাড়িতে যাতায়াত করতেন তিনি। সেই সূত্রেই পরিচয় হয় খেয়া আক্তারের সঙ্গে। শুরুতে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতা। এলাকায় শুরু হয় কানাঘুষা—রিয়ানের স্ত্রীর সঙ্গে আবিরের অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও এসব গুঞ্জনের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না, তবুও তা রিয়ানের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। ধীরে ধীরে সন্দেহ গ্রাস করে তার মানসিকতা।
এরই মধ্যে জীবিকার তাগিদে গত ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে রিয়ান চট্টগ্রামে তার পিতার কাছে চলে যান। বাড়িতে একা থাকেন তার স্ত্রী খেয়া আক্তার। এই সুযোগে ৮ মার্চ আবির হাসান খেয়ার বাড়িতে যান এবং তাদের একসঙ্গে তোলা একটি ছবি রাত ৮টার দিকে রিয়ানের মোবাইলে পাঠানো হয়।
ছবিটি যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে বিশ্বাসের শেষ দেয়াল। উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ রিয়ান সেদিন রাতেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং পরদিন ভোরে নিকলীর বাড়িতে পৌঁছান।
এরপরই ঘটতে থাকে একের পর এক রহস্যময় ঘটনা।গত ৯ মার্চ বিকেল তিনটার পর থেকে আবির হাসানের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। অবশেষে ১৩ মার্চ আবিরের পিতা সিদ্দিক মিয়া নিকলী থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের করেন।পুলিশ তদন্ত শুরু করে। সময় গড়াতে থাকে, কিন্তু কোনো সূত্র মিলছিল না।
অবশেষে গত বৃহস্পতিবার ২ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে নিকলী থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, সিংপুর ইউনিয়নের ডুবি হংডাইল হাওরের একটি ভুট্টাক্ষেতে মানুষের হাড়গোড় পড়ে রয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ রফিকুল ইসলাম সঙ্গীয় ফোর্সসহ।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় একটি মানব কঙ্কাল। পরবর্তীতে পরিহিত জামাকাপড় দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়—এটি নিখোঁজ আবির হাসানের মরদেহ।
এই ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া, সৃষ্টি হয় ব্যাপক চাঞ্চল্যের।
ওসি মোঃ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয় জোরালো তদন্ত অভিযান। তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে মাহমুদুল হাসান রিয়ানের ওপর। অভিযান চালিয়ে রাতেই তাকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রিয়ান ভেঙে পড়ে এবং শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বন্ধুকে ঘুরতে নিয়ে যান এবং নির্জন স্থানে সিগারেট খাওয়ার সময় বিদ্যুতের তার দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন আবির হাসানকে। পরে লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যান।
এই হত্যাকাণ্ড যেন একইসঙ্গে ভেঙে দেয় ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও মানবিকতার সব বন্ধন।
এ বিষয়ে নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন,“ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জিং ছিল। নিখোঁজ ডায়েরির পর থেকেই আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,“পুলিশ সবসময় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। যেকোনো অপরাধ দ্রুত উদঘাটনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকি এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।”
বর্তমানে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিকলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।