লুটপাটে ব্যাংকিং খাতের করুণ চিত্র
লেখক:মো বাইজিদ শেখ
এক টুকরো রঙিন স্বপ্ন নিয়ে যখন একজন সাধারণ কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকের দরজায় কড়া নাড়েন, তখন তাকে পার হতে হয় শত শত নিয়মের বেড়াজাল। সামান্য কয়েক হাজার টাকা ঋণের জন্য তাকে বন্ধক রাখতে হয় নিজের ভিটেমাটি। ঋণের কিস্তি দিতে দু-একদিন দেরি হলে সইতে হয় নোটিশ, মামলার হুমকি আর সামাজিক অপমান। অথচ, একই দেশে কিছু মানুষ কেবল একটি চকচকে সাইনবোর্ড, ভুয়া কাগজপত্র আর রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে ব্যাংক থেকে তুলে নিচ্ছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। আর সেই টাকা ফেরত না দিয়ে তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই চরম বৈষম্য আর অবিচারের নামই কি উন্নয়ন?
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় এক ক্যানসারের নাম 'খেলাপি ঋণ'। এটি এখন আর কোনো দুর্ঘটনা বা নিছক ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, বরং এক শ্রেণির প্রভাবশালীর জন্য রীতিমতো 'অধিকার'-এ পরিণত হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৌরাত্ম্যে আজ দেশে ব্যাংকিং খাত খাদের কিনারায়। সাধারণ আমানতকারীদের জমানো ঘাম ঝরানো টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার হচ্ছে, আর এদিকে দেশের ব্যাংকগুলোতে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ তারল্য সংকট।
একবার ভেবে দেখুন সেই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষটির কথা, যার সারাজীবনের সঞ্চয় রাখা আছে ব্যাংকে। বাজারে গেলে মূল্যস্ফীতির আগুনে তার হাত পোড়ে। সাধারণ মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎকারীরা পান ঋণ পুনঃতফসিল বা সুদ মওকুফের মতো বিশেষ আইনি সুবিধা। দেশের হাজার হাজার তরুণ যখন উচ্চশিক্ষা শেষে বেকারত্বের গ্লানি নিয়ে ঘুরছে, তখন এই বিপুল পরিমাণ আটকে থাকা বা পাচার হওয়া ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হতো, তবে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান হতে পারত।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কেন এই দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে আসে বিদ্যমান আইনি বিধান ও শাস্তির কাগজ-কলম বনাম নগ্ন বাস্তবতার চিত্র।
বাংলাদেশে ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের দমনে আইনি কাঠামোর যে একেবারে অভাব রয়েছে, তা কিন্তু নয়। বরং আইন অনুযায়ী এসব অপরাধের শাস্তি বেশ কঠোর:
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code): অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করা মূলত প্রতারণা (৪২০ ধারা) এবং অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের (৪০৬ ও ৪০৯ ধারা) সুস্পষ্ট অপরাধ। এসব ধারায় অপরাধীদের ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২: ব্যাংক লুট করে সেই অর্থ হুন্ডি বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হলে, এই আইনের অধীনে ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি পাচারকৃত অর্থের দ্বিগুণ বা অন্তত ১০ লাখ টাকা (যেটি বেশি) জরিমানা করা এবং পাচারকারীর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩: এই আইনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’দের (Willful Defaulters) আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ অমান্য করলে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং প্রতিদিনের ব্যর্থতার জন্য অতিরিক্ত ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তাদের বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি-বাড়ি নিবন্ধন এমনকি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রয়েছে।
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩: এই আইনের ৩৪ ধারা অনুযায়ী, ডিক্রি জারির পর কোনো খেলাপি যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ শোধ না করেন বা সম্পদ গোপন করেন, তবে আদালত তাকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের দেওয়ানি কয়েদ (Civil Imprisonment) বা জেলে পাঠাতে পারেন।
কিন্তু আইনের পাতায় থাকা এই কঠোর শাস্তিগুলো বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে কোথায়?
বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের আইনের প্রয়োগ যেন অনেকটা মাকড়সার জালের মতো; যেখানে ছোট দুর্বল পোকামাকড় আটকে যায় ঠিকই, কিন্তু রাঘববোয়ালরা অনায়াসেই তা ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। একজন সাধারণ কৃষক কৃষি ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে তার কোমরে দড়ি পড়ে। অথচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা প্রভাবশালীরা আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে উচ্চ আদালত থেকে রিট বা স্থগিতাদেশ (Stay Order) নিয়ে এসে বিচারের গতিকে বছরের পর বছর আটকে রাখেন।
অর্থঋণ আদালতগুলো আজ লাখ লাখ মামলার ভারে ন্যুব্জ। একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে দশকের পর দশক গড়িয়ে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার পুরো সুযোগটি নিয়ে খেলাপিরা তাদের সম্পদ বেনামে হস্তান্তর করে ফেলেন। অন্যদিকে, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া ঋণের অনুমোদন দিচ্ছেন, সেই ব্যাংক পরিচালক ও অসাধু কর্মকর্তাদের দণ্ডবিধির অধীনে শাস্তির আওতায় আনার নজিরও খুব সামান্য। আইন যখন প্রভাবশালীদের পকেটে বন্দি থাকে, তখন সে আইন সাধারণ মানুষের চোখে উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
একটি দেশের অর্থনীতি কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না, যদি সেখানে লুণ্ঠনকারীদের আইনি সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। ঋণখেলাপির এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হলে কেবল কাগজ-কলমে শাস্তির বিধান থাকলেই চলবে না। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মানি লন্ডারিং ও প্রতারণার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে আমূল কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনের পক্ষপাতহীন প্রয়োগ। সময় থাকতে এই ক্ষত সারিয়ে না তুললে, আগামী প্রজন্মের কাছে জবাবদিহির কোনো সুযোগই আমাদের অবশিষ্ট থাকবে না।
লেখা:মো বাইজিদ শেখ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়