এক মুঠো ধানের জন্য নারীর যুদ্ধ
বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বিপর্যস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অষ্টগ্রাম, ইটনা , মিঠামইনে অবশেষে দেখা মিলেছে স্বস্তির রোদের। আর সেই রোদের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগিয়ে এক মুঠো ধান বাঁচাতে খলায় নীরব যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের নারীরা।
মঙ্গলবার (১২ ই মে ) সরজমিনে, সকাল থেকে অষ্টগ্রামের বিভিন্ন খলা, অলওয়েদার সড়কের দুই পাশে এবং উঁচু স্থানে ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে শত শত নারীকে। কেউ ধান উল্টে দিচ্ছেন, কেউ বাতাসে উড়িয়ে ময়লা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরছেন শুকনো ধান। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের এই নিরলস পরিশ্রমে যেন ফুটে উঠেছে হাওরপাড়ের সংগ্রামী জীবনের বাস্তব চিত্র।
অষ্টগ্রামের দেওঘর, কলমা, কাস্তুল ও আবদুল্লাহপুর এলাকার খলাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই ধান বাঁচানোর কাজে ব্যস্ত সবাই। অনেক নারী শিশুদের সঙ্গে নিয়েই খলায় এসেছেন। ঘরের কাজ সামলে এখন তাদের একটাই চিন্তা যেভাবেই হোক ধান শুকিয়ে ঘরে তোলা।
দেওঘর গ্রামের গৃহবধূ আয়েশা খাতুন বলেন, কয়দিনের বৃষ্টিতে সব শেষ হওয়ার উপক্রম হইছিল। আজ রোদ পাইয়া খলায় আইছি। এই ধান বাঁচাইতে না পারলে সংসার চালানো কষ্ট হইয়া যাইবো।
অষ্টগ্ৰামের কলমা গ্ৰামের জেলে
পাড়ার কৃষাণী রিতা রানী দাস বলেন," সকাল থেইক্কা ধান উলডাইতেছি। রোইদ কতখান থাকবো কেডা জানে ,ধান না হুগাইলে খাইমু কী?তাই যতখান পারি হুগাইতেছি"।
তবে রোদের দেখা মিললেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা কাটেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অষ্টগ্রামের অনেক নিচু জমিতে এখনো পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও পানির মধ্যেই ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। কৃষকরা জানান, মিঠামইনের ভরাজি বিল ও শিংরাকান্দা বিলে পানির মধ্যে ধান কাটতে গিয়ে অনেকেই যোকের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ভয়ে অনেক শ্রমিক পানিতে নামতে সাহস পাচ্ছে না। হারভেস্টার মেসিন দিয়ে ও জমিতে এখন আর ধান কাটা সম্ভব না। কৃষকরা বিকল্প উপায়ে ধান কাটার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক ইব্রাহিম মিয়া জানান, আর দুই-তিন দিন রোদ থাকলে অনেক ধান রক্ষা করা সম্ভব। আবার বৃষ্টি আইলে বড় ক্ষতি হইবো।
এদিকে জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে মজুরিও। পানিতে নেমে ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিকদেরও পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলা।
রোদে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও অষ্টগ্রামের হাওরজুড়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে খলায় নারীদের এই নীরব যুদ্ধই এখন কৃষকদের শেষ আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।