ইসলামে বহুবিবাহ: অপব্যাখ্যা ও বাস্তবতা
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলামী শরিয়তে সাধারণভাবে বিয়ে করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তবে ব্যক্তির অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিয়ের বিধান ভিন্ন হতে পারে— কখনো ফরজ, কখনো ওয়াজিব, কখনো মুস্তাহাব, আবার কারো জন্য হারামও হতে পারে। এ বিষয়ে অন্য কোনো সময়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে ইন শা আল্লাহ।
বহুবিবাহ বলতে একজন ব্যক্তির একাধিক জীবনসঙ্গী থাকা বোঝায়। যখন একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকে, তাকে বলা হয় “পলিজিনি” (Polygyny), আর একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকলে তাকে বলা হয় “পলিঅ্যান্ড্রি” (Polyandry)। ইসলামে পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে পলিজিনির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা নারীদের মধ্যে যাদের ভালো লাগে তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজন পর্যন্ত বিয়ে করতে পারো। তবে যদি আশঙ্কা করো যে সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনই যথেষ্ট।” — সূরা আন-নিসা: ৩
এই আয়াতে “সুবিচার” শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম একাধিক বিয়েকে বাধ্যতামূলক করেনি; বরং কঠোর দায়িত্ব ও ন্যায়ের শর্ত আরোপ করেছে। তাই চারটি বিয়ে করা সুন্নত বা বেশি সওয়াবের কাজ— এ ধারণা সঠিক নয়। এটি একটি অনুমতি (মুবাহ), কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর বহু সমাজ ও ধর্মে একাধিক বিয়ের প্রচলন ছিল। প্রাচীন যুগে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে ইসলামই প্রথম এই বিষয়ে নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয় এবং ন্যায়বিচারকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে।
বর্তমান যুগে দেখা যায়, অনেকেই ইসলামের নাম ব্যবহার করে একাধিক বিয়ে করলেও স্ত্রীর হক ও সুবিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে সুবিচার করতে না পারলে একাধিক বিয়ে করা বৈধ নয়।
এখন প্রশ্ন হতে পারে— ইসলাম কেন এই অনুমতি দিল?
প্রাকৃতিকভাবে ছেলে ও মেয়ে প্রায় সমান অনুপাতে জন্মায়। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, কন্যা শিশুরা পুত্র শিশুদের চেয়ে রোগ-প্রতিরোধে অধিক সক্ষম। একেবারে শৈশবে কন্যা শিশুদের তুলনায় পুত্র শিশু মৃত্যুর হার বেশি। এছাড়া বর্তমান পৃথিবীতেও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, নিউইয়র্কে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ বেশি এবং পুরো আমেরিকাতে এই ব্যবধান প্রায় ৩০ লক্ষ। বিশ্বের আরও অনেক দেশের চিত্রই এমন।
এমতাবস্থায় যদি প্রতিটি পুরুষ কেবল একটি বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অনেক নারীই হয়ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবেন না। এর ফলে সমাজে গোপন সম্পর্ক, জিনা ও ব্যভিচারের মতো সামাজিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা পরিবারে ও সমাজে আরও বেশি অশান্তি নামিয়ে আনে।
এটাও সত্য যে, কোনো নারী স্বাভাবিকভাবেই তার স্বামীকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করতে চান না। ইসলাম এই মানবিক অনুভূতিকেও সম্মান করে। তাই একাধিক বিয়েকে সাধারণ নিয়ম না বানিয়ে, বিশেষ পরিস্থিতির জন্য সীমিত অনুমতি হিসেবে রেখেছে।
অতএব, ইসলামে বহুবিবাহ কোনো ভোগবাদী ধারণা নয়; বরং এটি দায়িত্ব, ন্যায়বিচার ও সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিধান। ইসলামের প্রতিটি বিধানের মতো এটিও মানুষের কল্যাণ ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত।
— জুবায়ের আহমদ চৌধুরী
দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ,কুষ্টিয়া
jubayerahmod.jubayer@icloud.com