বাবাকে নিয়ে না বলা কথা
প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস পালন করা হয়। সে অনুযায়ী এবছর ২১ জুন বাবা দিবস। প্রত্যেকের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নাম হলো বাবা। শৈশবকাল থেকে বাবা আমাদের স্নেহ, শাসন, দিকনির্দেশনা ও আর্থিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অক্লান্তভাবে আগলে রাখেন। কিন্তু, আমরা অনেকেই মূল্যবোধের অভাবে জীবনে বাবার গুরুত্ব ভুলে যাই। সন্তান হিসেবে বাবার প্রতি আমাদের সবারই কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা প্রকাশের লক্ষ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কতিপয় শিক্ষার্থীদের বাবাকে নিয়ে না বলা কথা তুলে ধরছি আমি মো. জাহিদ হাসান, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
না বলা ভালোবাসার নাম—বাবা
বাবা দিবস এলে মনে পড়ে যায় আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির কথা। ছোটবেলায় যখন বাবার হাত ধরে বেড়ে ওঠার কথা ছিল, তখনই পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য তিনি প্রবাসে পাড়ি জমান। তাঁর অনুপস্থিতিতেই কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর, পড়াশোনা এবং বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপ। দূরত্ব ছিল, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ কখনো দূরে ছিল না।
বাবা আমার সকল স্বপ্ন পূরণের নীরব কারিগর। তিনি আমার সব আবদার পূরণ করেন, প্রতিটি কাজে উৎসাহ দেন এবং ভেঙে পড়ার মুহূর্তে সাহস জোগান। একজন অভিভাবকের পাশাপাশি তিনি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। অথচ তাঁকে কখনো বলা হয়নি– ‘‘বাবা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’’ না বললেও তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সকল অনুভূতিতে মিশে আছে। একজন বাবার গুরুত্ব শুধু পরিবারের উপার্জনকারী হিসেবে নয়; তিনি সন্তানের সাহস, ভরসা ও পথপ্রদর্শক। তাই সন্তানের দায়িত্ব হলো বাবার ত্যাগকে সম্মান করা, তাঁর স্বপ্ন ও কষ্টের মূল্য দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি অর্জনের মাধ্যমে তাঁকে গর্বিত করা। বাবা দূরে থাকলেও তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ ও প্রেরণাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমার কাছে না বলা ভালোবাসার এক সুন্দর নাম—বাবা।
ফাইজা আক্তার আলো
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ।
বাবা : স্নেহ, মায়া ও দায়িত্বের অতন্দ্র প্রহরী
জীবনের অনেক অনুভূতি সহজে প্রকাশ করা যায়, কিন্তু বাবাকে নিয়ে মনের গভীরে জমে থাকা কথাগুলো বলা হয়ে ওঠে না। আমরা মায়ের স্নেহের কথা সহজে বলি, কিন্তু বাবার নীরব ত্যাগ অনেক সময় অগোচরেই থেকে যায়। বাবা সেই মানুষ, যিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিজের স্বপ্ন, আরাম ও ইচ্ছাগুলো নিঃশব্দে বিসর্জন দেন। তাঁর কঠোরতা আসলে ভালোবাসারই অন্য এক রূপ। সন্তানের সফলতার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বাবার অসংখ্য নির্ঘুম রাত, শত দুশ্চিন্তা ও অক্লান্ত পরিশ্রম। বাবার মূল্য তখনই উপলব্ধি করতে পারি যখন বাবা নামের বট বৃক্ষের ছায়া আমাদের উপর থেকে চলে যায়। লিখতে গিয়ে আজ মনে হচ্ছে, বাবাকে অনেক কথাই বলা হয়নি। বলা হয়নি “আব্বু, আপনার ত্যাগের জন্য আমি কৃতজ্ঞ, আপনার কষ্ট আমি বুঝি, আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসি।” অথচ এই কথাগুলোই একজন বাবার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ইসলামেও পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই সন্তানের দায়িত্ব শুধু তাঁদের ভরণ-পোষণ করা নয়; বরং সম্মান করা, খোঁজখবর নেওয়া, তাঁদের অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং বার্ধক্যে পাশে থাকা। বাবা একটি ছায়াঘন বৃক্ষের মতো, যার ছায়ায় সন্তান নিরাপদে বেড়ে ওঠে। তাই বাবা দিবস শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; বরং বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। আসুন, আজ আমরা বাবাকে বলি “আব্বু, আপনি আছেন বলেই আমার পথচলা এতটা দৃঢ় ও সুন্দর হয়েছে। আব্বু আপনাকে অনেক ভালোবাসি।"
সাইফুদ্দীন সিদ্দীক
শিক্ষার্থী, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।
‘তোমার ত্যাগেই গড়া আমার আগামী’
নীরব ভালোবাসার এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো বাবা। ছোটবেলা থেকে সকল আবদার পূরণে প্রথম হ্যাঁ-সূচক শব্দটি আসে বাবার কাছ থেকেই। দায়িত্ব পালনের এক মহানায়ক তিনি। বাবারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেন পরিবার ও সন্তানদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। বছরের পর বছর, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে যান পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। কখনো কখনো সন্তান বা পরিবারের কেউ যখন বলে, “তুমি আগামীর জন্য কিছুই জমা করোনি”, তখন বাবার কাছ থেকে উত্তর আসে, “আমার সন্তানেরাই আমার আগামী, তারাই আমার সম্পদ।” সন্তান হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাবা যুদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যান। নিজের কষ্ট, ক্লান্তি, কিংবা অপূর্ণতার কথা খুব কমই প্রকাশ করেন। বাবারা ভালো খেতে চান না, বরং সন্তানকে ভালো খাওয়াতে চান; ভালো পোশাক পরতে চান না, নিজের স্বপ্নের চেয়ে সন্তানের স্বপ্নকেই বড় করে দেখেন। নীরব এই সংগ্রামে বাবার চোখের ক্লান্তিও যেন লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার গভীরে। তবুও তিনি কখনো থেমে যান না, কারণ তার প্রতিটি পদক্ষেপেই লুকিয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি সন্তানের কাছে তার বাবা সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি সাহস, ত্যাগ, ভালোবাসা ও নির্ভরতার আরেক নাম। বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।
মো: মাসরুর রহমান
শিক্ষার্থী, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ।
বাবা : যাকে এক উপমায় প্রকাশ করা কঠিন
বাবা এমন একজন, যিনি পাশে থাকলে জীবনের সব খারাপ সময়ে অবিশ্বাসে ঘেরা এই পৃথিবীতে নির্ভয়ে সব বাধা পার করা যায়। বাবার দেওয়া একটু উৎসাহ, ভরসা, আস্থা একটা সন্তানের কাছে অনেক বড় পাওয়া। প্রতিটি সন্তানের কাছেই বাবা একটা বটবৃক্ষের মতো– কখনো শত আঘাতের প্রতিরোধোক ঢাল, আবার কখনো তিনি একাধারে সন্তানের কাছে আলাদীনের চেরাগের দৈত্য। বাবা তাঁর সন্তানের আবদার মেটাতে কখনো ক্লান্ত হননা। এককথায় বলতে গেলে– নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অপর নাম বাবা, অনুপ্রেরণার আরেক নাম বাবা। নিজের সমস্ত শখ, চাওয়া-পাওয়া অপূর্ণ রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর মানুষটাই হলো বাবা। আসলে বাবার সংজ্ঞা কখনো এক বাক্যে দেওয়া যায় না। বাবাকে বাইরে থেকে অনেক শক্ত মনে হলেও, ভেতরে সন্তানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা যে কতটা স্নিগ্ধ তা কখনো মাপা যায় না। দায়িত্ব ও কর্তব্যের আরেক বলিষ্ঠ নাম বাবা। ভালো থাকুক দুনিয়ার সব বাবারা। আমি আমার বাবাকে বলতে চাই– ‘পৃথিবীতে এখন আমার বাবা, মা দু'ই তুমি।অনেক ভালোবাসি তোমাকে বাবা। তুমি যেন সুস্থ থাকো, ভালো থাকো এই কামনা করি। আমার মুখের হাসিটা বেঁচে আছে তোমারই জন্য। আমার পৃথিবীটা আজও সুন্দর শুধু তোমার জন্য। বাবা, তুমি আমার সুপার হিরো, আমার সামনে আগানোর প্রেরণা।’
মেহনাজ আফরিন মেঘ
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ।
সন্তান হোক বাবার চোখের মণি
বাবা দিবসে সকল বাবাদের প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বাবা– যিনি পরিবারের সকলের সুখের জন্য নিজের সকল সুখকে বিসর্জন দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকেন। পরিবারের একটি চাওয়া পূরণের জন্য হাজারো বাঁধার মধ্যে সংগ্রাম করে থাকেন। একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা সংসার চালানোর জন্য অনেক সময় নিজে না খেয়েও সকলের জন্য খাবারের যোগান দেন। একজন বাবা কোনদিনও তাঁর মনের কথা কাউকে খুলে বলতে পারেননা, তাঁর বুকে বিদ্যমান থাকে হাজারো কষ্ট ও ব্যথা। সন্তান লালন-পালনের জন্য ছোটবেলা থেকে বাবা তাঁর সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, তাকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে থাকেন। যতই বিপদ হোক না কেন বাবা সব সময় সন্তানের মাথার উপর নিরাপদ ছায়া হিসেবে থাকেন। এমনটাও দেখা যায় যে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা টাকার অভাবে নিজের চিকিৎসা করাতে পারেননা, কিন্তু সন্তান যখন অসুস্থ হয় যত কষ্টই হোক বাবা কোনো সময় টাকার কথা চিন্তা করেন না। বাবা সবসময় সন্তানের সুন্দর ও সুস্থ দেহের জন্য জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করে থাকেন। কিন্তু, এমন অনেক হতভাগা সন্তান আছে যারা বাবার সাথে অনেক খারাপ ও নিকৃষ্ট ব্যবহার করে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাবাকে ফেলে রাখে বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া দুঃখে বাবার অন্তরে ভূমিকম্প চলতে থাকে যেটার সমাধান একমাত্র সন্তানই দিতে পারে। পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, বাবাকে কখনো ছেড়ে দিয়েন না, তাঁর চোখের মনি হওয়ার চেষ্টা করুন।
মোঃ তৌহিদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফি বিভাগ।
বাবা পৃথিবীর সবথেকে ভালো বন্ধু
বাবাকে নিয়ে কখনো কিছু বলা হয়ে ওঠে না। আমরা অনেক সময় বাবাকে ভালোবাসি, সম্মান করি, কিন্তু তা মুখে বলি না। হয়তো বাবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এমনই—অনুভূতি আছে, প্রকাশ নেই। ছোটবেলা বাবার হাত ধরে হাঁটা, স্কুলে যাওয়া, আবদার পূরণ করা, কিংবা কোনো ভুল করলে শাসন করা— এসব স্মৃতি আজও মনে পড়ে। তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শিখেছি যে বাবার প্রতিটি শাসনের আড়ালে ছিল গভীর ভালোবাসা। নিজের কষ্ট, ক্লান্তি আর অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো লুকিয়ে রেখে তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন আমাদের ভালো রাখতে। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাবার পরামর্শ আমাকে সাহস জুগিয়েছে। যখন কোনো কাজে ব্যর্থ হয়েছি, তখন বাবার কথাগুলোই নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে আমাকে। পরিবারের জন্য তাঁর নিরন্তর পরিশ্রমের মূল্য অসীম। বাবা দিবসে শুধু একটি কথাই বলতে চাই— ‘বাবা, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তোমার ত্যাগ, ভালোবাসা, আর ছায়ার জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞ। তুমি ভালো থেকো, সুস্থ থেকো। তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি।'
মো: হাবিবুর রহমান জিহাদ
শিক্ষার্থী, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ।