ত্যাগ ও ধৈর্যের শিক্ষা নিয়ে এলো মহররম
মহররম আরবি বারো মাসের মধ্যে প্রথম, মহররম কে বলা হয় শাহরুল্লাহিল মুহাররম, তথা আল্লাহর প্রিয় মাস। এটি চারটি হারাম মাসের একটি। আমরা অনেকেই শুধু রমজান আসলেই ইবাদতে মনোযোগী হই, সচেতন হই, কিন্তু আরও যে সম্মানিত আরবি মাস রয়েছে সে গুরুত্ব ও ফজিলত জানা ও নিজেদের জীবনে প্রয়োগ তো দূরের কথা, অনেকেই হয়ত আরবী বারো মাসের নামই ঠিকভাবে স্বরণে রাখি না। মহররম মাসের গুরুত্ব উপলব্ধির মাধ্যমে আত্নশুদ্ধি, ত্যাগ ও নৈতিক জাগরণ হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। মহররম মাসের গুরুত্ব ও আত্মপোলব্ধি সম্পর্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মতামত তুলে ধরছি আমি নওশিন শারমিলি, শিক্ষার্থী, আল ফিকহ এন্ড ল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া।
শাহরুল্লাহিল মুহাররম
রমজানের পর আমার পছন্দের মাস সম্পর্কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে সবার আগে যে মাসটির নাম আসবে, সেটি হলো মুহররম মাস। রমজান পরবর্তী নফল রোজা রাখার জন্য এর চেয়ে উত্তম মাস সম্ভবত আর নেই। তবে এ মাসের আলাদা একটা বিশেষত্ব আমাদের জীবনে আছে। এই মাসে পৃথিবীর আতঙ্ক ফেরাউন যখন তার প্রজাদের জীবন অতিষ্ট করে তুলেছিলো, কায়েম করেছিলো এক খোদাদ্রোহী অবাধ্যতার কঠিন শাসন, তখন শোষণের অত্যাচারে নিষ্পেষিত মুসলিম সম্প্রদায় খুঁজছিলো এক চিলতে বাঁচার মতো আশ্রয়। এই সেই মহিমান্বিত মাস, যে মাসে মহান আল্লাহ ফেরাউনের রাজত্ব, বড়ত্ব, মহত্ত্ব আর মানসিক দাসত্বের সকল দম্ভের অস্তিত্ব চূর্ণ করে দেন নীল জলরাশির প্রবল চাপের আস্তরণে। এই সেই মাস যে মাসে প্রকৃত সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকারকারী দাম্ভিক মূর্খ সম্প্রদায়ের হাত থেকে নূহ (আ) বাঁচিয়েছিলেন সত্য ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী মুমিন মানুষগুলোকে। এই সেই মাস যে মাসে আমাদের প্রিয় নবী আমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম (আ) মহান রবের কৃপায় জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে জানান দিয়েছিলেন এক আল্লাহর অস্তিত্বের সত্যতা। আবার এ মাসই আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে আমাদের প্রিয় ইমাম হোসাইনকেও।
আমল, আখলাক, ইবাদতের বাইরেও এ মাস আমাদের শিক্ষা দেয় তাকওয়ার। সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাকওয়া, যা আপনাকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাবে যেখানে দুনিয়ার বাধা বা সংগ্রাম দূরে থাক সরাসরি জাহান্নামের কড়াল আগুনের লেলিহান শিখা পাশ কাটিয়ে চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে। ঠিক যেমন মুসা (আ) জানতেন না তাঁর লাঠির আঘাতে পথ তৈরি হবে, ইব্রাহিম (আ) জানতেন না তাঁর জন্য আগুনও শীতল হয়ে যাবে। আপনার বিশ্বাস দৃঢ় করুন, এ ঈমানই আপনাকে নিয়ে যাবে শান্তি, মুক্তি ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ শিখরে।
শান্ত শিশির ইসলাম
শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন এন্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগ।
বরকতময় ও আত্নশুদ্ধির মাস
হিজরি ১২ মাসে এক বছর এবং প্রথম মাস হচ্ছে মুহররম। এটি অনেক বরকতময় এবং ফজীলত পূর্ণ একটি মাস। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "নিশ্চয়ই যখন আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তখন থেকেই আল্লাহর লিখন ও গণনায় মাসের সংখ্যা বারো চলে আসছে। এর মধ্যে চারটি হারাম মাস। এটিই সঠিক বিধান। কাজেই এ চার মাসে নিজেদের ওপর জুলুম করো না।" ( সূরা তাওবা : ৩৬) চারটি হারাম মাস হচ্ছে মহররম, রজব, জিলক্বদ এবং জিলহজ্জ। এখানে আমাদের নিজেদের প্রতি জুলুম করা বলতে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্য হওয়াকে বুঝিয়েছেন । হারাম কাজ থেকে আমাদের সবসময়ই বিরত থাকা প্রয়োজন। তবুও এই আয়াতে বিশেষভাবে জোর প্রদান করা হয়েছে। মহররম একটি হারাম মাস। আর এই মাসে সংঘটিত কোনো অন্যায় বা জুলুম অনান্য মাসের তুলনায় অধিক মারাত্মক। আমরা অনেক সময় অপরের উপর জুলুম না করলেও আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করে ফেলি। তাই আমাদের উচিৎ সকল প্রকার জুলুম থেকে বিরত থাকা। অন্যদিকে মুহররম মাসে আমাদের অধিক পরিমাণ নফল ইবাদত করা উচিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন - " রমজানের পর সর্বোত্তম সাওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহররম।" রাসূল (সা.) মহররম মাসের ১০ তারিখ সাওম পালন করতেন এবং আমাদেরকেও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন “আশুরার দিনের সাওমের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমার প্রত্যাশা, আল্লাহ এর দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছরের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন।” আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো এবং এতে ইহুদিদের বিরোধিতা করো—আশুরার আগের দিন কিংবা পরের দিনও রোজা রাখো।" (মুসনাদে আহমাদ) এ বছর মহররমের ১০ তারিখ তথা ২৬ জুন শুক্রবার আমরা রোজা রাখতে পারি । এবং এর আগে ও পরে তথা ৯ বা ১১ মুহররম তারিখেও রোজা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে ফরজ বিধানগুলো দিয়েছেন সেগুলো পালনের পাশাপাশি নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারি এবং অবাধ্য নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। তাই আমাদের উচিৎ বেশি বেশি নফল ইবাদত করা, আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণে রাখা এবং তারই নিকট সাহায্য কামনা করা। হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন - "তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ, আর তুমি যদি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে তিনি তোমাকে দেখছেন”। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মুহররমের শিক্ষা অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুক। আমিন।
সুমন রানা
শিক্ষার্থী ,ল এন্ড ল্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ।
মহররম: আত্মশুদ্ধি ও জাগরণের বার্তা
ইসলামি নববর্ষের সূচনালগ্ন তথা পবিত্র মহররম মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মিক পুনর্জাগরণ, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক জাগরণের এক গভীর বার্তা নিয়ে আসে। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম এই মহররম (সূরা তাওবাহ: ৩৬)। এই মাসের ১০ই মহররম বা আশুরার দিনে মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ.)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। একই দিনে সংঘটিত হয়েছিল কারবালার শোকাবহ ঘটনা, যা সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পক্ষে অবিচল থাকার এক অনন্য ও চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মহররমের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো ‘মুহাসাবাহ’ বা আত্মসমালোচনা। হযরত ওমর (রা.)-এর বিখ্যাত উপদেশ— “তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেদের হিসাব চুকিয়ে নাও”— আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা অন্যের ভুল, দুর্বলতা ও ত্রুটি খুঁজে বের করতে যতটা সক্রিয়, নিজের চরিত্র ও আমল সংশোধনে ততটা মনোযোগী নই। ফেসবুক, ইউটিউব ও ভার্চুয়াল জগতের ট্রল, বিদ্রূপ ও সমালোচনার অসুস্থ প্রতিযোগিতা মহররমের প্রকৃত চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় যে সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো আপস করা যায় না, এমনকি জীবন দিয়েও নয়। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজার মাধ্যমে আত্মসংযম, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির এক মহান সুযোগ দিয়েছেন, যা মানুষের আত্মাকে নতুনভাবে জাগ্রত করে। তাই নতুন হিজরি বছরের শুরুতে আসুন, আমরা আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেকে দেখি, নিজের ভুলত্রুটি সংশোধনে আন্তরিক হই এবং নৈতিক পুনর্জাগরণের পথে এগিয়ে যাই। এই মহররম হোক সত্য, ন্যায়, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধিভিত্তিক একটি নতুন জীবনের দৃঢ় অঙ্গীকার।
মোঃ সাইফুল হক
শিক্ষার্থী, আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ।
প্রত্যেক মুমিন জীবনে বাস্তবায়িত হোক মুহররমের শিক্ষা
মুহাররম মাস শুধু এ কারণেই গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ নয় যে এটি হিজরী সনের প্রথম মাস, বরং ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনার কারণেই এ মাসের এতো গুরুত্ব ও তাৎপর্য। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই মাসটি গভীর ভাবগাম্ভীর্য, আত্মত্যাগ এবং আত্মোপলব্ধির মাস। মুহাররমের মূল শিক্ষা: ১. অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: মুহাররম মাস আমাদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিবাদ করার শিক্ষা দেয়।
২. ন্যায় ও সত্যের পথে অটল থাকা: মুহাররম আমাদের শেখায় যে শত বাঁধা আসলেও, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হলেও সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের পথে টিকে থাকতে হয়। মুসলিম ইতিহাসে হুসাইন ইবনু আলী (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনাকে ধৈর্য, ত্যাগ ও নীতির এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ৩. আল্লাহর ওপর ভরসা: মুহাররম স্মরণ করিয়ে দেয় যে কঠিন পরিস্থিতিতেও মুমিন আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে আশা হারায় না। মূসা (আ.) এর সময়ে আশুরার দিনে আল্লাহ তাঁর ও তাঁর অনুসারীদেরকে জালিম শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এটি ঈমান ও তাওয়াক্কুলের বড় শিক্ষা।
আত্মসমালোচনা (মুহাসাবা): নতুন হিজরি বছর শুরু হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে আত্মসমালোচনার ক্ষেত্রে যেসব প্রশ্ন আমরা নিজেদেরকে করতে পারি: ১. আল্লাহর অধিকার (হাক্কুল্লাহ): বিগত বছরে আমার ফরজ ইবাদতগুলো (যেমন: নামাজ) কতটা নিয়মতান্ত্রিক ছিল?, আমি কি ইচ্ছাকৃত কোনো বড় গুনাহে লিপ্ত ছিলাম, যা থেকে এখনো তওবা করা হয়নি? ২. মানুষের অধিকার (হাক্কুল ইবাদ): আমার আচরণ বা কথার দ্বারা কি আমার পরিবার, বন্ধু বা কোনো মানুষ কষ্ট পেয়েছে?, কারো পাওনা বা আমানত কি আমার কাছে আটকে আছে যা ফিরিয়ে দেওয়া উচিত? এসব প্রশ্নের মাধ্যমে নিজেদের আত্মসমালোচনা করতে পারলে আমাদের নতুন বছরটি আরও সুন্দরভাবে কাটানো সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের মুহাররমের শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)
সাহাফ আদনান
শিক্ষার্থী, দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।
মহিমান্বিত ও দোয়া কবুলের মাস মহররম
মহররম ইসলামের অন্যতম সম্মানিত ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। মহান আল্লাহ তাআলা আসমান-জমিন সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মাস ও সময়ের পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে যে, বারো মাসের মধ্যে চারটি মাস বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ; মহররম তার অন্যতম। এ মাসে অন্যায়, ঝগড়া-বিবাদ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহররমের ১০ তারিখ আশুরা, ইতিহাসের এক মহিমান্বিত দিন। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, এ দিনে হজরত আদম (আ.) তওবা কবুলের সৌভাগ্য লাভ করেন, হজরত নূহ (আ.) মহাপ্লাবনচ থেকে মুক্তি পান এবং হজরত আইয়ুব (আ.) কঠিন রোগব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করেন। মানবজাতির ইতিহাসে এ দিনকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা ও স্মরণীয় ঘটনা। তবে আশুরার সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় হলো কারবালার প্রান্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। সত্য, ন্যায় ও আদর্শ রক্ষায় তাঁর আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মহররম আমাদের শিক্ষা দেয়, সকল সংকট ও বিপদের প্রকৃত উদ্ধারকর্তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা। পাশাপাশি এটি অন্যায় ও জুলুমের কাছে মাথা নত না করে সত্যের পথে অটল থাকার প্রেরণা জোগায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ আমরা সাময়িক স্বার্থের জন্য নীতি ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে দ্বিধা করি না। মহররমের শিক্ষা যদি ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়িত হয়, তবে অশান্তি, অন্যায় ও নৈতিক অবক্ষয় অনেকাংশে দূর হয়ে একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
আবদুল্লাহ আল নোমান
শিক্ষার্থী, আরবী ভাষা ও সাহিত্যে বিভাগ।
শুধু আনুষ্ঠানিকতা, আত্নগঠন হোক মহররমের মূল লক্ষ্য
হিজরি সনের প্রথম মাস পবিত্র মহররম মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা এবং নতুনভাবে জীবন গঠনের এক মহিমান্বিত আহ্বান। ইসলামে এটি চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম, যে মাসে পাপ থেকে বিরত থাকা এবং নেক আমলের প্রতি অধিক মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। মহররম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু ক্যালেন্ডার বদলালেই চলবে না; বদলাতে হবে আমাদের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মকে। নতুন হিজরি বছর শুরু হোক আত্মসমালোচনার মাধ্যমে। আমরা কি আল্লাহর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করছি? আমাদের নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক আচরণ কতটুকু উন্নত হয়েছে? পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আমরা কতটা পালন করছি? মহররমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ত্যাগ, সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ইমাম হুসাইন রাঃ ও তাঁর সঙ্গীরা কারবালার প্রান্তরে অন্যায়, জুলুম ও অসত্যের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে শাহাদাত বরণ করেন। কারবালার মর্মস্পর্শী ঘটনা আমাদের শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকাই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। অন্যায়, মিথ্যা, হিংসা, অহংকার ও স্বার্থপরতা থেকে দূরে থেকে তাকওয়াভিত্তিক জীবন গড়ে তোলাই এ মাসের মূল শিক্ষা। এ মাস আমাদের ধৈর্য, সংযম, ক্ষমাশীলতা ও আত্মত্যাগের চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করে। বিশেষ করে আশুরার রোজা ইবাদত, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে বিভোর না হয়ে আখিরাতের সফলতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাও মহররমের অন্যতম শিক্ষা। পবিত্র মহররমকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের মাস হিসেবে গ্রহণ করি। বিগত জীবনের ভুলগুলো সংশোধন করে নেক আমল, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির আলোকে নতুন হিজরি বছরকে অর্থবহ করে তুলি। মহররম হোক আমাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন, সত্যের প্রতি অঙ্গীকার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন সূচনা।
সাইফুদ্দীন সিদ্দীক
শিক্ষার্থী, দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।