জীবনের দর্পণে বাবার প্রতিচ্ছবি
প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস পালন করা হয়। সে অনুযায়ী এবছর ২১ জুন বাবা দিবস। প্রত্যেকের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নাম হলো বাবা। শৈশবকাল থেকে বাবা আমাদের স্নেহ, শাসন, দিকনির্দেশনা ও আর্থিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অক্লান্তভাবে আগলে রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে জীবনের দর্পণে তাকালে সবার আগে আমি আমার বাবাকে দেখতে পাই। ছোটবেলা থেকে বাবার কঠোর শাসনের কারণে আমি কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের হয়েছি। বড় হয়ে পরিবারের বাইরের পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল বলে বাবার প্রতি খানিকটা ক্ষোভ ছিল। কিন্তু এখন বুঝি, ছোটবেলায় আমার উপর বাবার ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণ কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে। এলাকায় আমার সমবয়সী অনেকে আজ মাদকের কালগ্রাসে দূর্বিষহ জীবনযাপন করছে। বাবার শাসন ও সঠিক দিকনির্দেশনাই আমাকে তাঁদের থেকে আলাদা করেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরুর পরও প্রথম দিকে কখনো তিনি একসাথে পুরো মাসের খরচের টাকা পাঠাতেন না। কারণ তিনি ভালো করেই জানতেন, অতিরিক্ত টাকা পেলে বাজে খরচের মাধ্যমে সন্তানের বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কথায় আছে, ‘অর্থই অনর্থের মূল।’ নিজের চোখেই দেখছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় শিক্ষার্থীদের মাদক গ্রহণের মহাযজ্ঞ। সময়ের প্রয়োজনে এখন কিছুটা হলেও জীবন সম্পর্কে আমার বোধ জন্মেছে। বাবার আদর্শ– দায়িত্ববোধ, কর্মস্পৃহা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকার, নম্রতা প্রভৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার এখনও অনেক বাকি আছে আমার। জীবনে শিক্ষার শুরুই হয়েছিল বাবার কাছে, এখনও শিখছি। নিজের চোখেই দেখি, সংসারের সমস্ত সংকট তিনি কীভাবে একা মোকাবিলা করেন। নিজে ভালো কাপড় না পড়লেও আমি ও আমার বোনকে কখনোই অভাব বুঝতে দেন না। আমাদের শখ পূরণে কখনো তাঁকে না বলতে শুনিনি। একবার দূর্ঘটনায় বাবা মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। নিজের হাতে বাবার রক্তমাখা শরীরটা নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলাম। তখন আমার শুধু মনে হয়েছিল, যেকোন কিছুর বিনিময়ে আমি বাবাকে সুস্থ দেখতে চাই। লোহার মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন, নিজেকে এক যোদ্ধা মনে হচ্ছিলো। সেদিনের স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়। সেদিনের পর থেকে প্রতিনিয়ত বাবাকে হারানোর ভয় পাই। স্কুল পর্যায়ে অনেক চেষ্টা ও আকাঙ্ক্ষার পরও যখন একের পর এক খারাপ ফলাফল করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তাম, তখন বাবা আমাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিতেন। ফলাফল খারাপ হলেও তিনি আমাকে মিষ্টি খাওয়াতে ভুলতেন না। মাথার উপর বাবার ছায়া আছে বলেই আমি জীবনে এতদূর এগোতে পেরেছি। জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে বাবা আমাকে পরামর্শ দেন। তবে, পরিবারের অনেক কাজে বাবাও এখন আমার সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ জানতে চান। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত হয়েও বাবার অবদান ভুলে যায়। নিজে সুখে জীবনযাপন করার জন্য বিয়ের পর অনেকেই বাবা-মাকে আলাদা রাখে, বাবাকে বোঝা মনে করে। তখন শেষ বয়সে বাবার স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। কিংবা, অযত্নে অবহেলায় নিজ বাড়িতেই বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যান। সেইসব হতভাগা সন্তানদের বলতে চাই, আপনার বাবা আপনাকে কখনোই বোঝা মনে করেননি, আপনি সবসময় আপনার বাবার চোখের মণি। বাবার দোয়া ও পরিশ্রম ছাড়া কখনোই আপনার জীবনে সফলতা আসেনি। আপনিও একসময় বৃদ্ধ হবেন, আপনি আপনার বাবার সাথে যেমন আচরণ করছেন, আপনার সন্তানও আপনার সাথে তেমনি করবে। সামনের দিনে বাবাকে যেন ভালো রাখতে পারি, প্রাণভরে ভালোবাসতে পারি- জীবনে এতটুকু বড় হতে চাই। ছোটবেলায় বাবা যেভাবে আমাকে যত্ন করেছেন, আমিও বাবার শেষ বয়সে ঠিক সেভাবেই সেবা ও যত্ন করতে চাই। জীবনে বাবার মতো একজন ভালো মানুষ হতে চাই। পরিশেষে বলতে চাই, বাবা আমার আদর্শ, শক্তি, অনুপ্রেরণা এবং মা আমার সান্ত্বনা।
লেখক,
মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া