যেখানে মেঘ পাহাড়কে জড়িয়ে ধরে
একঘেয়ে জীবনের ব্যস্ততা কখনো কখনো আমাদের ক্লান্ত ও বিরক্ত করে তোলে। তখন মন চায় দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে পাহাড়ের বুকে, মেঘের রাজ্যে। এমন এক জায়গায়, যেখানে মেঘ এসে পাহাড়কে জড়িয়ে ধরে আর প্রকৃতি তার অপরূপ সৌন্দর্য উজাড় করে দেয়। সেই ইচ্ছা থেকেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ঈদের পর বান্দরবান ভ্রমণে যাব।
আমি, শাহরিয়া, হামজা, অমি ও মাহাদী পাঁচ বন্ধু মিলে যাত্রার পরিকল্পনা করি। ছোটবেলা থেকেই পাহাড় দেখার প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। তাই ভ্রমণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, উত্তেজনাও ততই বাড়ছিল।
নির্ধারিত দিনে আমরা যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ভ্রমণের শুরুটা ছিল ট্রেনে, আর এটি ছিল আমার জীবনের প্রথম ট্রেনযাত্রা। তাই আগ্রহটা ছিল অন্যরকম। ট্রেনে উঠেই জানালার পাশের আসনটি দখল করে নিলাম। জানালা দিয়ে আসা শীতল বাতাস আর ছুটে চলা প্রকৃতির দৃশ্য আমাকে যেন অন্য এক জগতে নিয়ে গিয়েছিল।
ঢাকায় পৌঁছে আমরা বাসে করে চকরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেখান থেকে একটি চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে শুরু হয় আমাদের প্রকৃত ভ্রমণ। গাড়ি যত লামা উপজেলার দিকে এগোচ্ছিল, ততই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একের পর এক সবুজ পাহাড়। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য দেখে আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
প্রথমে আমরা আলীকদমে যাই। সেখানে অবস্থিত বিখ্যাত আলীর গুহা আমাদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। সরু ও আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গুহার ভেতর প্রবেশ করার অভিজ্ঞতা ছিল রোমাঞ্চকর ও স্মরণীয়।
এরপর আমরা মিরিঞ্জা ভ্যালির একটি রিসোর্টে যাই। তবে সেখানে পৌঁছাতে নিচ থেকে প্রায় দশ মিনিট খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়েছিল। আমরা সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষ করে আমি ও মাহাদী হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। মাহাদী তো মাঝপথে বসেই পড়েছিল! কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে সব ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল।
চূড়ায় উঠতেই মেঘ এসে আমাদের ছুঁয়ে দিল। মনে হচ্ছিল আমরা যেন মেঘের রাজ্যে এসে পৌঁছেছি। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, আর সেগুলোকে ঢেকে রেখেছে অসংখ্য সাদা মেঘ। বৃষ্টির হালকা ছোঁয়ায় পরিবেশ আরও শীতল ও মনোরম হয়ে উঠেছিল। উপর থেকে নিচের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর বুকে এক টুকরো জান্নাত।
প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য দেখে মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মুগ্ধতা আরও বেড়ে গেল। আমরা অনেক আনন্দ করেছি, অসংখ্য ছবি তুলেছি এবং জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করেছি।
সময় খুব দ্রুতই কেটে গেল। ফেরার সময় মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। তখন মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি “যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়।” তাই অসংখ্য স্মৃতি আর কিছুটা মন খারাপ নিয়ে আমরা ফিরে এলাম। কিন্তু মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সেই সৌন্দর্য আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।
মো: জাহিদ হাসান
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ,কুষ্টিয়া