মাতারবাড়ীতে বাড়ী থেকে বন্যার পানি সরাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন যুবক
এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার:
কক্সবাজারের বন্দর নগরী মাতারবাড়ীতে তিনটি পানি নিষ্কাসনের খালের মুখ বন্ধ করে দেয়ার খেসারত দিচ্ছে এলাকাবাসী।জলাবদ্ধতায় গ্রামের পর গ্রাম ক্ষেতের ফসল চিংড়িঘের ডুবে আছে গত একসপ্তাহ ধরে।সর্বশেষ গত ৯ জুলাই রাতে মাতারবাড়ি সাইরার ডেইল এলাকায় বসতবাড়ির পানি সরাতে গিয়ে বানেরজলে ডুবে প্রাণ হারান এক যুবক।
সে ওই এলাকার ছাবের আহমদের ছেলে মোঃ আজিজ( ২৮) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিহতের বড় ভাই নাজেম উদ্দিন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ জুলাই রাত প্রায় ১১টার দিকে টানা বৃষ্টিতে বাড়ির উঠান ও ঘরে পানি ঢুকে পড়লে তা বের করার উদ্যোগ নেন আজিজ। পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে তিনি উঠানে ইট ও মাটি দিয়ে পথ তৈরি করছিলেন। একপর্যায়ে দরজার পাশ দিয়ে পানি বের করার সময় কখন যে পানির স্রোতে আটকা পড়ে জ্ঞান হারিয়ে পানিতে পড়ে গিয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন।
কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী ঘরের দরজা খুলে বাইরে এসে দেখেন, আজিজ উঠানের জমে থাকা পানিতে অচেতন অবস্থায় ভাসছেন। পরে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বদরখালী জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ জুলাই রাত আনুমানিক ১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আজিজের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সাইরারডেইলসহ মাতারবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের বাড়িঘর থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, গত ৫০ বছরে বৃষ্টির পানি জমে মাতারবাড়িতে কখনো জলাবদ্ধতা হয়নি।গত ২/৩ বছর ধরে অল্প বৃষ্টিতে মাতারবাড়ি জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে। এর কারণ কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে রুস্তমের দোনা, টিয়াকাটি, মগডেইল বাজার সংলগ্ন খাল, সিকদার পাড়া খালের ১২ টি স্লুইসগেট বন্ধ বন্ধ হয়ে যায়।কারণ বিভিন্ন প্রকল্প হওয়াতে জমির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সব খাল বন্ধ করে এবং ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি কোহেলিয়া নদী ও সাগরে নেমে যেতে বাঁধা প্রাপ্ত হচ্ছে।শুধু মাত্র রাঙাখালী খালের একটি স্লুইসগেট ছাড়া বাকী সব গেইট বন্ধ থাকায় পানি চলাচলে বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাঙাখালী খালের রাজঘাট নতুনবাজার অংশের বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকায় জবর দখল করে এলাকার প্রভাবশালী মহল সাগর থেকে মেশিন দিয়ে মাটি ভরাট করে খালের স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করে দেয়ায় জলাবদ্ধতায় জনদূর্ভোগ আশংকাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এসএম আবু হায়দার বলেন,মাতারবাড়িতে অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে। যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের সকল পথ বন্ধ তাই একটু বৃষ্টিতে গ্রাম, বাজার স্কুল মসজিদ মাদ্রাসা সব ডুবে একাকার হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলায় গত এক সপ্তাহে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। তারা দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।