অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে তাড়াইল উপজেলার শতবর্ষী ধলা জমিদার বাড়ি
রুহুল আমিন, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ধলা জমিদার বাড়ি আজ অবহেলা, অযত্ন ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে। একসময়ের প্রভাবশালী এই জমিদার বাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা বিলীন হয়ে গেলেও অবশিষ্ট ভবনগুলো এখনো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলা ১৩৩১ সালে জমিদার গিরিশ চন্দ্র পাল বর্তমান নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার কাটল বাড়ির জমিদারদের কাছ থেকে তিন আনা জমিদারি ক্রয় করেন। পরে বাংলা ১৩৩৩ সালে তিনি ধলায় নির্মাণ করেন এই জমিদার বাড়ি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটির উদ্বোধনের সময় ৪০ মণ মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল।
একসময় পাঁচটি ভবন, একটি মন্দির, দুটি শানবাঁধানো পুকুর, বিশাল দিঘি, সিংহদ্বার ও বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ নিয়ে গড়ে উঠেছিল ধলা জমিদার বাড়ি। বর্তমানে তিনটি ভবন টিকে থাকলেও সেগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চারপাশ আগাছা ও আবর্জনায় ঢেকে গেছে।
জমিদার বাড়ির ভেতরে এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রেললাইনের মতো মোটা লোহার পাত। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় সেগুলোতে মরিচা ধরেছে। স্থানীয়দের ধারণা, এগুলো একসময় ভবনের নির্মাণকাজ বা স্থাপনার কাঠামোগত কাজে ব্যবহৃত হতো। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, জমিদার গিরিশ চন্দ্র পাল এলাকায় একজন কঠোর ও বর্ণবাদী জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, নিম্নবর্ণের মানুষের চলাচল ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ ছিল। তবে এসব তথ্য মূলত স্থানীয় জনশ্রুতি, এ বিষয়ে পর্যাপ্ত লিখিত ঐতিহাসিক দলিল সহজলভ্য নয়।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জমিদার পরিবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় চলে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় জমিদার বাড়ির একটি ভবনে ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় বর্তমানে ধলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধলা ইউনিয়ন পরিষদ ও ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলছে। স্থানীয়দের মতে, পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতেই প্রথমে ধলা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা পল্লব পাল বলেন, “ধলা জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে কোনো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ভবনগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে এটি সংরক্ষণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এটি একটি ঐতিহাসিক ও পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ধলা জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা গেলে এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।