লাভ না হওয়ায় কুবিতে ‘ইয়োর ক্যাম্পাস’-এর ভেন্ডিং মেশিন বন্ধ
বাবলু দেব, কুবি প্রতিনিধি :
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের আধুনিক সুবিধা দিতে চালু হওয়া 'ইয়োর ক্যাম্পাস' এর সেবা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ব্যয়ের আনুপাতিক লাভ না হওয়ার অজুহাতে অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অর্থ দাবি করে ভেন্ডিং মেশিনের
সেবা বন্ধ করে দিয়েছে পরিচালনা প্রতিষ্ঠান 'গেট-এইড লিমিটেড'। তবে চালু রয়েছে ওয়াশিং মেশিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি 'গেট-এইড লিমিটেড' (ইয়োর ক্যাম্পাস) এর সাথে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলের একটি এক্সক্লুসিভিটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার রেফারেন্স নম্বর ছিল– জিএএলওয়াইসি/সিওইউ/০৫০২২০২৫/০১
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হল কর্তৃপক্ষ প্রথম পক্ষকে (ইয়োর ক্যাম্পাস) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্থান ব্যবহারের সুবিধা প্রদান করে, যার বিনিময়ে কোনো ফি বা ভাড়া নেওয়া হয়নি। এর বিপরীতে তারা শিক্ষার্থীদের ভেন্ডিং মেশিন, ওয়াশিং স্টেশন, স্মার্ট লকার ও স্মার্ট বিনের মতো আধুনিক সেবা দেওয়ার কথা।
তবে সেবা চালুর প্রায় দেড় বছর অতিক্রম হলেও স্মার্ট লকার ও স্মার্ট বিন সেবা এখনো চালু করেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি। বিজয়-২৪ হল, কাজী নজরুল ইসলাম হল ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ভেন্ডিং মেশিন ও ওয়াশিং স্টেশন চালু করা হলেও সুনীতি শান্তি হল ও নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী হলে শুধুমাত্র ওয়াশিং মেশিন সেবা চালু করা হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে বন্ধ রয়েছে ভেন্ডিং মেশিন সেবা।
এদিকে সম্প্রতি দীর্ঘ ৭ দিন বন্ধ অবস্থায় পরে ছিল ওয়াশিং মেশিন। যা গত ৫ জুলাই পুনরায় চালু করা হয়।
কোম্পানিটি দাবি করে, ক্যাম্পাস থেকে যে পরিমাণ আয় হচ্ছে তা তাদের পরিচালনা ব্যয়ের তুলনায় কম। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে টাকা দাবি করে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী হল কর্তৃপক্ষ কোনো আর্থিক দায়ভার বহনে বাধ্য না থাকায় টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর জের ধরেই ক্যাম্পাস জুড়ে সেবা বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
ইয়োর ক্যাম্পাসের কুবি শাখার সেলসম্যান মো. শাহরিয়ার হোসেন অমিত বলেন, 'প্রথম দিকে ভালো বিক্রি হলেও ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। প্রথম দিকে সমস্যা হিসেবে হলগুলোতে নেটওয়ার্ক ইস্যু চিহ্নিত করা হয়। পরে এন্টেনা লাগিয়ে এর সমাধান করা হলেও বিক্রি বাড়ানো সম্ভব হয় নি।'
তিনি আরো বলেন, 'কোম্পানি কর্তৃক ভর্তুকি বাবদ ক্যাম্পাস থেকে প্রতি মাসে ২০,০০০ টাকা করে দাবি করা হয়। কিন্তু ক্যাম্পাস থেকে এই বিষয়ে আগ্রহ না দেখানোই এবং কোম্পানির ব্যয় বহন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ায় তারা বর্তমানে ভেন্ডিং সেবা বন্ধ রেখেছে।'
অমিত আরো বলেন,'কোম্পানি থেকে ক্যাম্পাসে আর ব্যবসা না করার সিদ্ধান্তও গ্রহন করা হচ্ছে।' তারা খুব শীগ্রই ক্যাম্পাস থেকে ভেন্ডিং ও ওয়াশিং সেবা উঠিয়ে নিবেন বলে জানান তিনি।
তবে ভেন্ডিং সেবা বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীরাই অভিযোগ জানিয়েছেন। তাদের মতে ভেন্ডিং চালু থাকলে মধ্যরাতে দোকানপাট বন্ধ থাকলেও এখান থেকে খাওয়া যেত, কিন্তু এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইয়ামিম হাসান বলেন, 'মাঝে মধ্যে রাতে ক্ষুধা লাগলে এখান থেকে খেতে পারতাম বাইরে যাওয়া লাগতো না। তবে এখন ভেন্ডিংগুলো বন্ধ থাকায় রাতে ক্ষুধা লাগলেও খেতে পারছি না। অনেক রাতে আবার দোকানও খোলা থাকে না, তাই অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে।'
বিজয় ২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মেশকাত বলেন, 'রাত জেগে পড়াশোনা করার সময় বিশেষ করে পরীক্ষার দিনগুলোতে রাতে যখন সব দোকানপাট বন্ধ থাকে, তখন ক্ষুধা লাগলে হাতের কাছেই থাকা ভেন্ডিং মেশিন থেকে অল্প খরচে খাবার পাওয়া যেত, বাইরে যাওয়ার ঝামেলা ছিল না। কিন্তু এখন মেশিনগুলো বন্ধ হয়ে পরে থাকায় মাঝরাতে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। '
একই হলের আরেক শিক্ষার্থী মো: শরিফুল আলম বিজয় বলেন,' সকালে ক্লাসে যাওয়ার আগে নাস্তা হিসেবে এখান থেকে বিস্কুট কিনে খেতে পারতাম। তাছাড়া, খেলাধুলা করে আসার পরে কোল্ড ড্রিংকস সহ বিভিন্ন হালকা নাস্তা খেতে পারতাম। কিন্তু এখন ভেন্ডিং বন্ধ হয়ে পরে থাকায় বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় নষ্ট হয় আমাদের।'
হল প্রশাসন জানায়, তারা সমপরিমাণ লাভ পাওয়া সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি মেশিনগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্যে আবেদনও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এব্যাপারে বিজয় ২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান বলেন,' ভেন্ডিংগুলো থেকে যে পরিমাণ বিক্রয় আশা করা হয়েছিল, সে পরিমাণ হচ্ছে না। এতে কোম্পানি তাদের ব্যয় বহনের মতো আয়ও করতে পারছে না। তাই তারা সেবাটি বন্ধ করে দিয়েছে।'
কোম্পানি কর্তৃক দাবিকৃত ভর্তুকির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের হলের মিলের জন্যই শিক্ষার্থীদের ভর্তুকি দিতে পারছি না, এখানে ভর্তুকি কিভাবে দিব। এক্ষেত্রে আমরা রাজি হয়নি।'
কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ মো: হারুন বলেন, 'কোম্পানি পর্যাপ্ত লাভ করতে না পারায় সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি তারা সেবাটি একেবারে বন্ধ করে মেশিনগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদনও করেছে।'
তিনি আরো বলেন, ‘তাদের প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করে এই ব্যাপারে চূড়ন্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তারা যে ভর্তুকি চাচ্ছে তা আমাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নই। আমরা হলেই ভর্তুকি দিতে পারছি না।’