মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮

অনলাইন ডেস্ক ১১ July ২০২৬ · Saturday · ০৯:২৬ অপরাহ্ণ
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮

এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার:

টানা ৯ দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। টেকনাফের সেন্ট মার্টিনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

জেলায় পাহাড় ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে নারী শিশু রোহিঙ্গাসহ ২৮ জনের প্রাণ হানির ঘটনা ঘটেছে। 

কক্সবাজার - চট্টগ্রাম রেল লাইনের উপর বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় রেল চলাচল বন্ধ থাকায় বেড়েছে চরম জনদূর্ভোগ। কক্সবাজার চট্টগ্রাম সড়কের চকরিয়া, ঈদগাঁও লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার ১১ টি পয়েন্টের উপর বন্যার পানি জমে থাকায় সড়ক যোগাযোগ ও আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে জরুরি প্রয়োজনে লোকজন বিরতি করে যানবাহন পাল্টিয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম যাতায়াত করছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।মহেশখালী - কক্সবাজারের সী ট্রাক সার্ভিস আজ সকাল থেকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করায় জনদূর্ভোগ কিছুটা লাগব হয়েছে। মহেশালী - কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ এর হস্তক্ষেপে সী ট্রাক সার্ভিস ৭ দিন পর চালু হয়েছে। 

জেলার বিভিন্ন উপজেলার সড়ক, উপ-সড়ক, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয়দের দাবি, জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা এখন বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। জেলার ১০ উপজেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছেন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার  সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। আশ্রয় নিয়েছেন ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ১৪ হাজার ৬১ জন। দুর্গতদের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদুর রহমান জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা দেওয়া হবে।

এদিকে শনিবার  ভোর থেকে আবারও বিভিন্ন এলাকায় পানি বাড়তে শুরু করে।  বিশেষ করে চকরিয়া উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় হাসনাতু জান্নাত (১২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত হাসনাতু জান্নাত ওই এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে। একই ঘটনায় তার দুই বোন জেরিন মনি (৮) ও শাওরিন মনি (৬) অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, নৌকাডুবির পরপরই ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কক্সবাজারে ডুবুরি দল না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দলের সহায়তায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ চলছে। লোকালয়ে পানি কিছুটা বাড়লেও মাতামুহুরী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছিল শুক্রবার কিন্তু শনিবার বৃষ্টির মাত্রা তীব্রতর হলে আবার পানি বাড়তে শুরু করে।স্থানীয় চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোবারক আলী জানান, আজ নতুন করে আরো ১২ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জনদূর্ভোগ আশংকাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড় কমিটির সকল নেতৃবৃন্দকে বানবাসীর পার্শ্বে দাড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগও দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা জমির উদ্দিন বলেন, ঘরে চাল-ডাল থাকলেও রান্না করার মতো জায়গা নেই। মাটির চুলা পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো বা রান্না করা খাবার।

চকরিয়ার কাকরা, সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। যেসব স্থানে বৃহস্পতিবার হাঁটুপানি ছিল, শুক্রবার, শনিবার সেখানে কোমরসমান পানি দেখা গেছে।

পানি বাড়ায় গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বরইতলীর বাসিন্দা আব্দুল আজিজ জানান, পাঁচটি গরুই তাঁর পরিবারের একমাত্র সম্বল। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নৌকায় করে গরুগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি বাড়ির ছাদে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জমান বলেন, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কিছু মানুষ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেও অধিকাংশ মানুষ এখনো পানিবন্দি। দ্রুত শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

একইভাবে রামু উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাওয়ারখোপ, মিঠাছড়ি, ঈদগড়সহ ১১টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নও।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম বলেন, বসতঘর ও রান্নাঘরে পানি থাকায় বৃহস্পতিবার ভোর থেকে রান্না করতে পারেননি। স্বজনরা নৌকায় করে কিছু শুকনো খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। আশপাশের বেশিরভাগ পরিবারের অবস্থাও একই।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, উপজেলার সব ইউনিয়নই কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান,  বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে।

এদিকে আবহাওয়া অনুকূলে না ফেরায় এবং বিভিন্ন এলাকায় পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। দুর্গত মানুষের দাবি, দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, রান্না করা খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।

কক্সবাজার - রামু - ঈদগাঁও অর্থাৎ কক্সবাজার - ৩ আসনের এমপি লুৎফর রহমান কাজল বন্যা দূর্গত এলাকায় নগদ টাকা শুকনো খাবার নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাড়িয়েছেন।অন্য দিকে উখিয়া - টেকনাফের সংসদ সদস্য জেলা বিএনপির সভাপতি,  শাহজাহান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না, কক্সবাজার ২ মহেশখালী - কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদসহ বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা বানভাসিদের কাছে ত্রাণ ও অর্থ সহায়তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ঝাপিয়ে পড়েছেন। 

এদিকে জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারীর নেতৃত্বে একাধিক টীম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাড়িয়েছেন। জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্টান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সকল সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী  নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কাউকে কর্মস্থল ত্যাগ না করতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কন্ট্রোলরুম থেকে ২৪ ঘন্টা মনিটরিং করা হচ্ছে। র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী,সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে একাধিক  চিকিৎসক টীম জরুরি ঔষধ পত্রসহকারে, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একাধিক স্পেশাল টীম প্রস্তুত রয়েছে। রেড়ক্রিসেন্ট সেচ্ছাসেবক, স্থানীয় ইউপি পরিষদ উদ্ধার  তৎপরতা জোরদার করেছে। 

জেলা পরিষদ প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর জানিয়েছেন, বন্যা উপদ্রত এলাকায় জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন  ক্ষতিগ্রস্তদের চাহিদানুযায়ী সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। বন্যা মোকাবেলায় সরকারের সামগ্রিক প্রস্তুতি রয়েছে। এ ব্যাপারে কেউ দায়িত্ব অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশনা ও রয়েছে। 

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

লোহাগড়ায় ঘুমন্ত স্বামীর পুরু/ষাঙ্গ কেটে দিলো স্ত্রী, পুলিশিঅভিযানে আটক স্ত্রী

লোহাগড়ায় ঘুমন্ত স্বামীর পুরু/ষাঙ্গ কেটে দিলো স্ত্রী, পুলিশিঅভিযানে আটক স্ত্রী

লোহাগড়া প্রতিনিধি:নড়াইলের লোহাগড়ায় পারিবারিক কলহের জেরে ঘুমন্ত স্বামীর পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা...

২৮ July ২০২৬ · Tuesday · ০২:১৭ অপরাহ্ণ
জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কয়রায় জলবায়ু সহনশীল বসতবাড়ি উদ্বোধন

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কয়রায় জলবায়ু সহনশীল বসতবাড়ি উদ্বোধন

উপজেলা প্রতিনিধি (খুলনা):খুলনার কয়রায় জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তন সহনশ...

২৮ July ২০২৬ · Tuesday · ০২:১৩ অপরাহ্ণ