সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ

কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার সড়ক, ৩২ জনের মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক ১৪ July ২০২৬ · Tuesday · ১০:৪৪ অপরাহ্ণ
কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার সড়ক, ৩২ জনের মৃত্যু

এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার:

টানা আট দিনের ভয়াবহ বন্যার পর কক্সবাজারে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। সোমবার থেকে বৃষ্টিপাত প্রায় বন্ধ থাকায় প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। জেলার সড়ক, সেতু-কালভার্ট, বেড়িবাঁধ, কৃষিজমি, মৎস্য খামার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরী এলাকায় ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, কুতুবদিয়া, উখিয়া, টেকনাফ ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন সড়ক এবং আরও ৩৭টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, পেকুয়া উপজেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া মাতামুহুরীর ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। পাশাপাশি রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদও বন্যাকবলিত হয়।

বন্যা ও পাহাড়ধসজনিত বিভিন্ন ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা এবং ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা। এছাড়া আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, দুর্যোগে জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা। দুর্গত এলাকায় চাল, শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

তবে পানি নামতে শুরু করলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট এখনো তীব্র। অসংখ্য টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্গম কয়েকটি এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল আলম বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে নিহত ও আহত স্থানীয়দের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন, ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান বিতরণ করা হয়েছে।

এদিকে জেলা মৎস্য অফিসের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার এবং ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সাদা মাছ, চিংড়ি ও মাছের পোনাসহ প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বন্যায় জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নষ্ট হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩০৩টি খামারের ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু এবং ৩৩০টি পোলট্রি খামারের প্রায় ৯৮ হাজার হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় জেলার ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ এবং একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলোর জরুরি মেরামতকাজ শুরু করা হবে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করা হবে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিনে জেলায় মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ায় জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে পুনর্বাসন ও অবকাঠামো সংস্কারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কুড়িগ্রাম থেকেই যাত্রা শুরু, সারা দেশে সেবার লক্ষ্য এসকে কুরিয়ার সার্ভিসের

কুড়িগ্রাম থেকেই যাত্রা শুরু, সারা দেশে সেবার লক্ষ্য এসকে কুরিয়ার সার্ভিসের

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার সেবা পৌ...

২৭ July ২০২৬ · Monday · ১২:২৬ অপরাহ্ণ
খুলনা রেলস্টেশনে মার্বেল টাইলসের ওপর ঘুমিয়ে থাকা শিশুর ছবি নাড়া দিল হৃদয়

খুলনা রেলস্টেশনে মার্বেল টাইলসের ওপর ঘুমিয়ে থাকা শিশুর ছবি নাড়া দিল হৃদয়

মো: আল-মাহফুজ শাওন:রাত গভীর। চারপাশে নীরবতা। খুলনা রেলস্টেশনের মেঝেতে যাত্রীদের আনাগোনা থা...

২৭ July ২০২৬ · Monday · ১২:২৫ অপরাহ্ণ