বিশ্ববিদ্যালয় : জীবন গঠনের সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম
মো. জাহিদ হাসান:
অনেকেই বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবেগের জায়গা। প্রকৃত অর্থে এটি জীবনের এক বিশেষ পর্যায়, যেখানে ধৈর্য্য, পরিশ্রম এবং বুদ্ধিমত্তার বিচারে সফলতার মাপকাঠি নির্ণীত হয়। এখানে যথাযথ সিদ্ধান্ত যেমন জীবনকে সুন্দর করে তুলতে পারে, তেমনি একটি ভুল সিদ্ধান্ত জীবনকে করে তুলতে পারে বিভীষিকাময়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় আমরা প্রত্যেকেই জীবনকে ঘিরে এক রঙিন স্বপ্ন বুনি। বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই স্বপ্ন পূরণের সারথি মনে করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা নিজের কর্তব্য বিবেচনা করতেই ভুলে যাই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ নবীন শিক্ষার্থী নতুন শিক্ষাজীবন নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা করেন না। কিংবা, পরিকল্পনা করলেও কেউই তেমন কার্যকরী উপায়ে এগোতে পারেন না। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ নবীন শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো পরিবার থেকে দূরে বসবাস শুরু করেন। এসময় নতুন পরিবেশ দ্বারা তাঁরা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। তাই, প্রথমেই উৎকৃষ্ট পরিবেশে একজন নবীন শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর হল বা আশেপাশের মেসের পরিবেশ তেমন সুবিধাজনক নয়। দ্বিতীয়ত, বন্ধু নির্বাচনে ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ, বন্ধুত্বের আড়ালে স্বার্থান্বেষী মনোভাব মানসিক শান্তি নষ্টের ভয়ানক অস্ত্র, যার দ্বারা এক মুহূর্তেই আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়ে পড়তে পারে। চিন্তার বিষয় হলো সম্পর্কের মানসিক প্রভাব খুবই দীর্ঘস্থায়ী। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবার সাথে স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার জন্য বয়োজ্যেষ্ঠ দের সাথে সুসম্পর্ক রাখা জরুরি। তবে এক্ষেত্রেও সঠিক মানুষ নির্বাচন করা আবশ্যক। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তি বাড়ছেই। এছাড়া, অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ও অনিয়মিত ভাবে ধুমপান করে থাকে। অথচ, ক্যাম্পাসে মাদক নির্মূল ও তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় বন্ধে কর্তৃপক্ষের তেমন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী খারাপ সঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মাদক গ্রহণ করছে। অতিরিক্ত স্বাধীনতা এখানে মস্ত বড় একটি ফাঁদ। চাকচিক্যের মোহে পড়ে অহরহ শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংসের পথে। শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশার ফলে সামাজিক সম্পর্ক অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে এখানে।
এতো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মূল কর্তব্যটাই পালন করতে ভুলে যায়। পড়ালেখার জন্য এখানে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অলসতা ও স্বদিচ্ছার অভাবে একজন শিক্ষার্থী ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়েন। এমনও শিক্ষার্থী রয়েছে, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একবারও লাইব্রেরিতে যায়নি। একটি বই-ও না কিনে সিমেস্টারের পর সিমেস্টার পার করে দিচ্ছে তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও নকল প্রথা দেখলে অবাক হতে হয়। বেশিরভাগ শিক্ষকদের পাঠদান প্রক্রিয়া ও পরিক্ষার হলে দায়িত্বপালনে শিথিলতা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে রাজনীতি চর্চা শিক্ষার্থীদের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ও জীবন গঠনে শিক্ষকদের গুণগত প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থীরাও ভুল রাজনীতির ফাঁদে পড়ে জীবন নষ্ট করছে। অনেক শিক্ষার্থী অপরাধপ্রবণ ও নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত। এক্ষেত্রে, ক্যাম্পাসে রাজনীতির অপশক্তি চর্চায় প্রশাসনের নীরব ভূমিকাই দায়ী। পাঠ্যক্রমে জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও গবেষনাধর্মী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। পুঁথিগত জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উচিত বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়া। তবে, সংস্কৃতি চর্চার নামে আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অশ্লীলতা ছড়াচ্ছে তা থেকে দূরে থাকতে হবে। ইংরেজি ও বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি অন্য যেকোনো একটি ভাষা শেখা প্রয়োজনীয়। নিয়মিত পত্রিকা পাঠ ও বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তবে বিভাগীয় পড়ালেখায় অত্যধিক মনোযোগী হতে হবে। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও নিয়ম-কানুন পালনের সাথে সাথে নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিকতা অটুট রাখতে হবে। সবসময় ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করা উচিত। তবে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতামূলক মনোভাব বজায় রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে স্বাস্থ্য সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর হলের খাবার খুবই নিম্নমানের। তারপরও ব্যাক্তিগত উদ্যোগে সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পড়ালেখার ফাঁকে নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলা করতে হবে। যেকোনো ভালো কাজে উৎসাহ ও সহযোগিতা করতে হবে এবং হিংসাত্মক মনোভাব দূর করতে হবে। নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে নিজেকেই উদ্যমী হতে হবে। প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে। পড়ালেখার ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন না করে সৃজনশীল হয়ে উঠতে হবে। প্রতিযোগিতার এই যুগে শুধু সরকারি চাকরির পেছনে ছুটলে হবে না, নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে সফলতার অনন্য উচ্চতায় ওঠার চেষ্টা করতে হবে। অলসতা দূর করতে হবে, নিজের কাজ নিজেই করার চেষ্টা করতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনা করতে জানতে হবে। শিক্ষাজীবন পরবর্তী পরিকল্পনা আগেই করে ফেলতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সামনে এগোতে হবে। অযথা সময় নষ্ট না করে কর্ম স্পৃহা বাড়াতে হবে। মোবাইল আসক্তি কমাতে হবে। ক্যারিয়ার গঠনে শুরু থেকেই পরামর্শ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে হবে। বন্ধুদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আড্ডা ও ভ্রমণের সুযোগ হাতছাড়া না করাই ভালো। বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনের জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ হয়তো পাওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকেরই টিউশন করার প্রবণতা থাকে। তবে, আর্থিক সমস্যা না থাকলে অতিরিক্ত টিউশন করিয়ে সময় নষ্ট না করাটাই ভালো। যেকোনো সংকটে পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করা জরুরি। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী হতাশার নানা উপসর্গে ভোগেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেশি। এক্ষেত্রে, একাকীত্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে এবং যথাসম্ভব সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। পরিবারের লোকজনের উচিত নিয়মিত তাঁদের খোঁজখবর রাখা। শিক্ষার্থীদেরও উচিত দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা, পরিবারের হাল ধরতে নিজেকে প্রস্তুত করা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিবারের সাথে সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবছর রাষ্ট্রের অনেক টাকা বরাদ্দ থাকে। সুতরাং, দায়িত্বের জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের উচিত নিজেকে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সর্বোপরি, আত্ম উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারাটাই একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর স্বার্থকতা।
লেখক:
মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।