ইবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নাটক মঞ্চায়ন
মো. জাহিদ হাসান:
গতকাল বৃহঃস্পতিবার কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান), চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এবং বাংলা বিভাগের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. মো: সাইফুজ্ জামান স্যারের তত্ত্বাবধানে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে পরপর তিনটি নাটক মঞ্চায়ন করা হয়েছে।
নাটক তিনটি হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'রক্তকরবী', 'ডাকঘর' এবং 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসের নাট্যরূপ। একটি লিখিত নাটক তখনই প্রাণ পায়, যখন নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। সেই লক্ষ্যেই আমরা মঞ্চায়নের প্রায় ২০ দিন আগ থেকেই আমাদের ক্লাসের শেষে নাটকের রিহার্সাল করতাম। রিহার্সালে জামান স্যার আমাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে দ্রুত অভিনয় রপ্ত করতে সুবিধা হয়েছে।
পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় আমরা সবাই নাটকের পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ কস্টিউম ও অন্যান্য উপাদান সামগ্রী সাথে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধাণ ফটক থেকে বাসে উঠে রওনা দিই কুঠিবাড়ির উদ্দেশ্যে। শত ব্যস্ততার মাঝে অনেক দিন পর ক্লাসের সবাই একসাথে বাসযাত্রা করার মজাই আলাদা। গানের তালে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে আমরা চলতে শুরু করি। কুষ্টিয়া শহর থেকে স্যার আমাদের সাথে যোগ দেন। স্যারের সাথে ওনার স্ত্রী ও মেয়ে আমাদের আনন্দময় দিনটির ভাগিদার হয়েছিলেন দেখে ভালো লাগলো।
ক্যাম্পাস থেকে কুঠিবাড়ি কাছে হওয়ায় আমরা দ্রুতই সেখানে পৌঁছে গেলাম। আনন্দ উন্মাদনায় রাস্তা যেন আরো একটু দ্রুতই ফুরিয়ে গেল। যদিও এর আগে বন্ধুরা মিলে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক্লাসের সবার সাথে নাটকের উদ্দেশ্যে এসে মনে এক ভিন্নরকম রোমাঞ্চ তৈরি হলো। তার উপর যদি বর্ষার বৃষ্টি নামে, তাহলে তো কথাই নেই! আমরা সেখানে পৌঁছাতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ততক্ষণে আমরা কুঠিবাড়ির ভিতরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।
এতো বছর পরেও সেখানকার সবকিছুই প্রাণবন্ত মনে হলো। চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি; আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের দোতলা বাড়িটি, যেখানে বসে তিনি একসময় জমিদারি দেখাশোনা করতেন। এই কুঠিবাড়িতেই রবীন্দ্রনাথ অনেক খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্য রচনা করেছেন। কুঠিবাড়ির দোতলার বারান্দায় আমরা সবাই মিলে স্যারের নির্দেশনায় গলায় গলা মিলিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইলাম। বৃষ্টির মাঝে, রবীন্দ্রনাথের ঘরেই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার অনুভূতি ছিল ভীষণ আলাদা। পাশেই মাঠের মাঝে একটা ছাউনির ভিতরে সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেলাম। চারদিকে খোলা মাঠে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি দেখতে দেখতে খাওয়াটা মজার ছিলো।
স্যারের তত্ত্বাবধানে ও সহযোগিতায় বৃষ্টির কারণে আমরা কুঠিবাড়ির গ্রন্থাগারের ভিতরের বারান্দায় বসেই নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করলাম। স্যারের মেয়ের কন্ঠে একটি রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে শুরু হলো আমাদের নাটক। সকলের অসাধারণ অভিনয় দেখে সত্যি বিমোহিত হলাম। চরিত্রের জন্য একেকজন একেক ঢঙে সেজেছে। নাটকের জীবনমুখী আখ্যান চোখের সামনে দেখে অনেক কিছুই শিখলাম।
নানা প্রতিকূলতার মাঝেও সব আনুষ্ঠানিকতা ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল এবং বেশ আনন্দঘনই ছিল দিনটি। সেখানে অনেকগুলো দোকানপাটে নানা রকমের খেলনা, মাটির জিনিসপত্র, বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হচ্ছে দেখে এগিয়ে গেলাম। পছন্দ হতেই সেখান থেকে শখ করে একটি বাঁশি কিনলাম আমি। ফেরার আগে সকলের উৎফুল্ল প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্যারের সম্মতি নিয়ে আমরা কুঠিবাড়ির পাশেই পদ্মা নদীর পাড়ে ঘুরতে গেলাম। বর্ষাকালে নদীর পানি থৈ থৈ করছিল। দূরের নৌকা, আর নদীর উপর আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখতে দারুণ লাগছিল।
সময় স্বল্পতার কারণে আমরা দ্রুতই সেখানে থেকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ফেরার পথেও বাসের মধ্যে হৈ-হুল্লোড় এবং আনন্দ উন্মাদনার কোনো কমতি ছিল না। এই সুযোগে সবার সাথে বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা আরও গাঢ় হলো আমাদের। অল্প কিছুদিন পরেই হয়তো পড়ালেখা শেষে আমরা যে যার নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবো। চেনা মুখগুলো খুব শীঘ্রই হারিয়ে যাবে, কিন্তু এমন দিনের স্মৃতি কখনোই হারাবার নয়।
লেখক: মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।