আনন্দভ্রমণেই শেষ যাত্রা, সাঙ্গু নদীতে প্রাণ গেল অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের ছেলে নাহিয়ানের
রুহুল আমিন, তাড়াইল:
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবি) থেকে ভালো ফলাফল করার আনন্দ ভাগাভাগি করতে বন্ধুদের সঙ্গে বান্দরবানে বেড়াতে গিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার শিমুলআটি ভূঁইয়া বাড়ির সন্তান জাওয়াদ উল ইসলাম নাহিয়ান (২৪)। কিন্তু সেই আনন্দভ্রমণই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ সফর। বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নের রাজার পাথর এলাকায় সাঙ্গু নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সোমবার (২৭ জুলাই) দুই দফা জানাজা শেষে তাড়াইল-সাচাইল কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
নাহিয়ান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য হেলাল উদ্দিন সবুজের একমাত্র ছেলে। পরিবারসহ তিনি ময়মনসিংহ শহরের সাংকিপাড়া মাদরাসা কোয়ার্টার এলাকার ঝমঝম বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিইউবি থেকে ভালো ফলাফল করার পর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দভ্রমণে গত ২২ জুলাই বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন নাহিয়ান। ২৩ জুলাই সেখানে পৌঁছে তাঁরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষার্থী এই শিক্ষা সফরে অংশ নিয়েছিলেন। ২৪ জুলাই বিকেল ৫টার পর থানচি উপজেলার রাজার পাথর এলাকায় সাঙ্গু নদীতে নৌকাভ্রমণের সময় আকস্মিক নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর নাহিয়ান নিখোঁজ হন। ওই রাতেই পরিবার বিষয়টি জানতে পারে। এরপর শুরু হয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অপেক্ষা। ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে আসা বিশেষ ডুবুরি দল সারাদিন উদ্ধার অভিযান চালিয়েও তাঁর সন্ধান পায়নি। অবশেষে ২৬ জুলাই সকালে দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু নদীতে ভাসমান অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার অভিযানে থানচি ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম থেকে আসা বিশেষ ডুবুরি দল, বিজিবি, স্থানীয় গাইড ও বোটচালকেরা অংশ নেন। পরে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য লাশবাহী গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য নগদ আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
এ সময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা আফরিন নিহতের বাবা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য হেলাল উদ্দিন সবুজের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। যে কাঁধে সন্তানের হাত রেখে জীবনের স্বপ্ন বুনেছিলেন একজন বাবা, নিয়তির নির্মম পরিহাসে আজ সেই বাবার কাঁধেই উঠল একমাত্র সন্তানের নিথর দেহ। হৃদয়বিদারক এ দৃশ্যে উপস্থিত অনেকেরই চোখ ভিজে ওঠে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় শিমুলআটি ঈদগাহ ময়দানে নাহিয়ানের প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাড়াইল সাচাইল কাছেমুল উলুম মাদরাসা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাড়াইল-সাচাইল কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
শেষ বিদায়ে আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু,সহপাঠী, এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ অংশ নেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ উদ্ধারে সহযোগিতা করায় বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, বিশেষ ডুবুরি দল, স্থানীয় গাইড ও বোটচালকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মরদেহ পরিবহনের ব্যবস্থা ও শোকের এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য বান্দরবান জেলা প্রশাসনের প্রতিও আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
নাহিয়ানের অকাল মৃত্যুতে শিমুলআটি গ্রামসহ পুরো তাড়াইল উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে সবার কাছে দোয়া চেয়েছে।