গৌরীপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ বিপ্লবের বাবা পেলেন ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র
মোঃ শহিদুল ইসলাম, ময়মনসিংহ (গৌরীপুর) প্রতিনিধিঃ
ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কারফিউ ভেঙে রাজপথে আন্দোলনে এসে পুলিশের গুলিতে শহিদ বিপ্লব হাসানের বাবা মো. বাবুলকে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল/২৬) ২০লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়।
সঞ্চয়পত্র প্রদান করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।
এ সময় উপস্থিত ছিরেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) লুৎফুন নাহার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) উম্মে হাবীবা মীরা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন প্রমুখ।
গৌরীপুরে ২০২৪সনের ২০জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন বিপ্লব হাসান। কারফিউ ভেঙে সেদিনের মিছিলের অগ্রভাগে থাকা বিপ্লবের মাথায় পুলিশের বুলেট এক দিকে ঢুকে অপরপ্রান্ত দিয়ে বেড়িয়ে যায়। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শহীদ বিপ্লব হাসানের মা বিলকিস আক্তার বলেন, আমি ঘুমাতে পারি না। বারবার মনে হয়, এই তো বিপ্লব আমাকে ডাকছে। মা, মাগো- আমাকে নাস্তার টাকা দাও! ঘরের এ পাশ ও ওপাশেও ওর পায়ের শব্দ পাই। সে দিনের বুলেটের শব্দে মতো, কোনো শব্দ হলেই আমি এখনো আতংকে উঠি।
তিনি আরও বলেন, এই টাকা দিয়ে তো আর আমি আমার বিপ্লব হাসানকে পাবো না। তারপরেও সরকারের এ উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
শহিদ বিপ্লবের বাবা বাবুল মিয়া বলেন, ছেলে আমার দেশের জন্যে জীবন দিলেও পুলিশের চাপে ছেলের শান্তিপূর্ণ জানাযাও দিতে পারি নাই’। বাড়ির পাশেই ছেলেকে কবরস্থ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন- ‘ছেলের জানাযার পর প্রতিদিনই বাড়িতে পুলিশ আইতো, পুলিশের ডরে বাড়ি ছাইড়া আমি দিন-রাইত বাইরে থাকতাম। হাসিনা সরকরের পতন না অইলে মনে হয় ছেলের আন্দোলন করার অপরাধে আমার বাকি জীবন জেলেই থাকতে অইত’। কথাগুলো বলছিলেন শহীদ বিপ্লব হাসনের বাবা বাবুল মিয়া। তিনি আরও জানান, তার তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে সন্তান বিপ্লব হাসান সবার বড়। সে হাজী মোজাফফর আলী ফকির উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তিনি বলেন, সকালে তার মা‘র কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে নাস্তা খাওয়ার কথা বলে মিছিলে যোগ দেয় বিপ্লব।
ওইদিন ছিলো শনিবার, ২০জুলাই। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ছাত্রজনতা ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরে কলতাপাড়া বাজারে অবস্থান নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী ও নেতৃবৃন্দ। মা বিলকিস আক্তারের নিকট থেকে ৫০টাকা নিয়ে নাস্তা সেরে সেও এ আন্দোলনে যোগ দেয়। তবে মাকে বলেছিলো, নাস্তা সেরেই বাসায় ফিরবে। বাসা ফিরেছে দু:সাহসিক বিপ্লব নিথর দেহ নিয়ে, অন্যের কাঁধে ভরে। কথাগুলো বলছিলেন এ আন্দোলনের সহযোদ্ধা বাহালুল মুনশী। তিনি আরও বলেন, পুলিশের প্রথমে গুলি শেষ হয়ে যায়। এরপরে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আর পুলিশ আরো গুলি সংগ্রহ করে সংঘবদ্ধভাবে ছাত্রজনতার ওপর বুলেট চালায়। আমার সামনেই গুলিবিদ্ধ হয় বিপ্লব। সে ডৌহাখলা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদস্য ছিলো।
আন্দোলনের সহযোদ্ধা ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মো. বিল্লাল মিয়া জানান, আন্দোলনের সময় এসআই শফিকুল ইসলাম আন্দোলনে থাকা বিপ্লব হাসানকে টার্গেট করে খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। এতে গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কের ডেলটা মিল সংলগ্ন মসজিদের কাছাকাছি সড়কে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এ সময় আমরা কয়েকজন এগিয়ে গেলে পুলিশ আরো বেপরোয়া হয়ে গুলি চালাতে থাকে। এতে আমরা পিছনে সরে আসি। তখন এসআই শফিকুল ইসলাম সড়কে পড়ে থাকা বিপ্লবের মাথায় পরপর আরো দু‘টি গুলি করে। এর একটি বুলেট বিপ্লবের মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে যায়। পরে এস আই শফিক দম্ভ করে বলেছে- ‘এবার লাশ নিয়ে যা।’