রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
সারাদেশ

আইনি জটিলতায় ঝুলছে শিক্ষকদের পদোন্নতি, শাটডাউনে অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

Admin ২৩ April ২০২৬ · Thursday · ০৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
আইনি জটিলতায় ঝুলছে শিক্ষকদের পদোন্নতি, শাটডাউনে অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
আইনি জটিলতায় ঝুলছে শিক্ষকদের পদোন্নতি, শাটডাউনে অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আবদুল্লাহ আল  শাহিদ খান,  ববি  প্রতিনিধি

পদোন্নতির দাবিতে কর্মবিরতির পর এবার ‘ফুল একাডেমিক শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। গত বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকেও শিক্ষকেরা সরে দাঁড়ানোয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান শিক্ষক সংকট ও পদোন্নতি জটিলতার জেরে এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, উপাচার্য নানা অজুহাতে ৬০ শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে তুলছেন। পদোন্নতির দাবিতে ১০ এপ্রিল উপাচার্য ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে পাঁচ কার্যদিবসের আলটিমেটাম দেন শিক্ষকেরা। এতে সাড়া না মেলায় ১৯ এপ্রিল থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন সহযোগী অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন। পরবর্তীতে সোমবার অনশন ভেঙে শিক্ষকেরা কর্মবিরতি ও পূর্ণাঙ্গ শাটডাউনের ঘোষণা দেন।
এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাম্প্রতিক একটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ করছেন শিক্ষকেরা। ইউজিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, 'বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী চাকুরি, পেনশন, পদোন্নতি, পর্যায়োন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট সংবিধি, বিধি, প্রবিধি ইত্যাদি সংশোধন ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রণয়ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। পরবর্তীতে কেবল অনুমোদিত সংবিধি অনুসারে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়োন্নয়ন দেওয়া যাবে'।
শিক্ষকদের ভাষ্য, এই নির্দেশনার ফলে আইনগত বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ৩৫ ও ৩৭ ধারায় উল্লেখিত বিভিন্ন সংবিধি ও বিধি বর্তমানে অনুমোদিত অবস্থায় নেই। তারা মনে করছেন, এই সংবিধিহীন অবস্থায় একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে ভর্তি, পরীক্ষা ও ডিগ্রি প্রদানের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, 'শিক্ষকেরা ২০১৫ সালে তৈরি করা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালার ভিত্তিতে পদোন্নতি চাচ্ছেন। কিন্তু সরকার ২০১৭ সালে একটা নতুন 'স্ট্যান্ডার্ড' নীতিমালা তৈরি করে। আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের মতো করে নীতিমালা তৈরি করতো, একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেক রকম। আমরাও ২০১৫ সালে করেছিলাম। এটাকে ইউনিফাইড করার জন্য, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার মানে টিচারদের সাথে আলাপ আলোচনা করে তৈরি করেছিল। দীর্ঘদিন ওয়েবসাইটে দিয়ে রেখেছিল। কারো কোন আপত্তি আছে কিনা?'
তিনি আরও বলেন, 'পরে ২০২১ সালে এই নীতিমালাটা ইউজিসি হয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়। তখন সরকার একটা পরিপত্র জারি করে যে শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতির নূ্যনতম যোগ্যতার নির্দেশিকা হবে এটি। এর ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে যার মত করে নীতিমালা তৈরি করে নেবে। ওই নির্দেশিকা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবাই মেনে নিয়েছে। আমার জানামতে, তিন বিশ্ববিদ্যালয় এটা মানেনি। তার মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় একটা।'
বর্তমানে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা ৬০ জন শিক্ষকের মধ্যে ২৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৩০ জন সহকারী অধ্যাপক ও ৬ জন প্রভাষক রয়েছেন। ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী, অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের অন্তত ১২ বছরের মোট শিক্ষকতা ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। অথচ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞতা ও পদশূন্যতা উপেক্ষা করে ২৪ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা ইউজিসির অডিট প্রতিবেদনেও আপত্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
উপাচার্য এ বিষয়ে বলেন, 'আমাদের ২০১৫ সালের যে নীতিমালা আছে, সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডপ্ট করা। এই নীতিমালায় বিভিন্ন রেওয়াত দেওয়া আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ওই নীতিমালা বাদ দিয়ে অভিন্ন নীতিমালায় অনেক আগেই চলে গেছে। কিন্তু আমরা আগের জায়গাতেই রয়ে গেছি। ওই রেওয়াতের ভিত্তিতেই প্রমোশন চাওয়া হচ্ছে।'
তিনি আরও জানান, 'আমি আসার পর পরে দেখেছিলাম, আমাদের একটা নীতিমালা আছে এবং ২০১৫ সালের ওই নীতিমালার আলোকে আমি বোর্ড বসিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমাকে ইউজিসি থেকে একটা শক্ত চিঠি দেয়। চিঠিতে সুস্পষ্ট তিনটা পয়েন্ট দিয়ে আমাকে বলে অভিন্ন নীতিমালার আলোকে প্রমোশন দিতে হবে। এর প্রেক্ষিতে আমি গত সিন্ডিকেটে নীতিমালা প্রণয়ন বিষয়ে আমরা আলাপ আলোচনা করেছি। সিন্ডিকেট মেম্বাররা একটা ডিসিশন দেয় যে এক মাসের মধ্যে সংবিধি প্রণয়ন করে নিয়ে যেতে হবে। আগামী ২৮ তারিখে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা আছে, পরের সিন্ডিকেটে ওইটা প্রণয়ন করে নিয়ে যেতে হবে।'
উপাচার্য যোগ করেন, 'কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সংবিধি প্রণয়নের যে কমিটি করে দেওয়া হলো, সেই কমিটির টিচাররা ম্যাক্সিমামই সব পদত্যাগ করেছেন। এখন শিক্ষকেরা পদত্যাগ না করে দ্রুত আমাকে সহযোগিতা করলে আমি সংবিধি পাস করে নিয়ে আসতে পারবো। তখন শিক্ষকদের পদোন্নতি বা প্রমোশনগুলো দ্রুত চালু হবে।'
শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে এই জটিলতার ফলে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ৬০টি শূন্য পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগও আটকে আছে। তবে উপাচার্য আশা প্রকাশ করে বলেন, 'এইটা খুবই স্পষ্ট। আমাদের নয়টা শিক্ষক তো নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে আরও ২৪টা শিক্ষক লেকচারার নিয়োগের বিষয়টা ইউজিসির ফুল কমিশন মিটিং থেকে অলরেডি পাস হয়ে আছে। প্রায় ছয় মাস আগেই পাস হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই যে পদোন্নতি নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে এই জটিলতার কারণে সমস্যার সমাধান না করলে ওরা আমাদের অফিস আদেশটা এখনো দিচ্ছে না। পদোন্নতি বিষয়টা সমাধান হয়ে গেলে তখন ওগুলো সবই সমাধান হয়ে যাবে।'
এদিকে শাটডাউনের কারণে পরীক্ষার সময়সূচি ব্যাহত হওয়ায় সেশনজটের তীব্র শঙ্কায় আছেন শিক্ষার্থীরা। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন বলেন, 'নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই শিক্ষার পরিবেশ সচল থাকুক এবং আমাদের পরীক্ষাগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন হোক।'
'বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুরুতে বিষয়টি করার সময় হয়তো প্রযোজ্য নীতিমালা পুরোপুরি বিবেচনায় নেয়নি। তারা ২৪ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু পরে নীতিমালাগত জটিলতা সামনে আসে। বর্তমানে বড় সমস্যা হচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত অধ্যাপক পদের সীমা না থাকায় পদগুলো কার্যত ‘ব্লক’ অবস্থায় রয়েছে।' অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, ইউজিসি সদস্য
শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে উপাচার্য বলেন, 'আমি শিক্ষকদের কাছে অনুরোধ রেখেছি অনেক ছাত্ররা আছে, অনার্স পরীক্ষা দিচ্ছেন অন্তত তাদের পরীক্ষাগুলো চালু রাখার জন্য। একই সাথে অনেক শিক্ষার্থীরা আছে যাদের সার্টিফিকেট মার্কশিটগুলার দরকার। তাদের জন্য আমি বিশেষ ব্যবস্থায় সার্টিফিকেট মার্কশিট দেওয়ার জন্য কন্ট্রোলার সেকশনে বিশেষ ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।'
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুরুতে বিষয়টি করার সময় হয়তো প্রযোজ্য নীতিমালা পুরোপুরি বিবেচনায় নেয়নি। তারা ২৪ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু পরে নীতিমালাগত জটিলতা সামনে আসে। বর্তমানে বড় সমস্যা হচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত অধ্যাপক পদের সীমা না থাকায় পদগুলো কার্যত ‘ব্লক’ অবস্থায় রয়েছে।'
তিনি জানান, 'এ বিষয়ে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল, তবে সেটি কার্যকরভাবে অগ্রসর হয়নি।'
তিনি আরও আরও বলেন, ‘আমরা চাই না কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে বিষয়গুলোকে সমন্বয় করা। তবে তা অবশ্যই আইন ও বিধিমালার ভেতরে থেকেই করতে হবে। নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা অবসরে যাওয়ার সময় অডিট আপত্তির মুখে পড়তে পারেন। আমরা ভবিষ্যতের জন্য এমন কোনো জটিলতা তৈরি করতে পারি না। এখন সাময়িকভাবে কোনো সমাধান মনে হলেও পরে যখন সমস্যা তৈরি হবে, তখন তার দায় আমাদের ওপরই বর্তাবে—কেন আমরা আগে থেকে বিষয়টির সঠিক সমাধান করিনি।’

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি সিদ্ধান্ত এমপি শওকতুল  ইসলাম

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি সিদ্ধান্ত এমপি শওকতুল ইসলাম

 মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম কুলাউড়া উপজেলা প্রতিনিধিরবিবার (৭ জুন) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিন...

০৭ June ২০২৬ · Sunday · ০২:৫৫ অপরাহ্ণ