সড়কে ধান শুকিয়ে শেষ লড়াই হাওর পাড়ের কৃষকদের
বিজয় কর রতন,হাওর অঞ্চল প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পানি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আভাস মিললেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। কোথাও নদীর পানি কমছে, আবার কোথাও পানি বাড়ায় নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ধান শুকানোর উপযুক্ত স্থান না পেয়ে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ককেই খলা বানিয়ে ধান বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার সরেজমিনে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অষ্টগ্রাম জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে কাস্তুল ইউনিয়নের ভাতশালা হয়ে মিঠামইন পর্যন্ত এবং ইটনা উপজেলার চিলনী গ্রামের পাতলামুরা ও উত্তর বন্দের মাঝামাঝি প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়ে সড়কের ওপর ধান ছড়িয়ে শুকাচ্ছেন কৃষকরা।
স্থানীয়রা জানান, হাওরের অধিকাংশ খলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ধান শুকানোর আর কোনো জায়গা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সড়কের ওপর ধান শুকাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এতে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি সামান্য বৃষ্টি এলেই সব শ্রম বৃথা যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, এবারের বোরো মৌসুমে অনেক ধানে ‘ছাড়া’ গজিয়ে গেছে। ফলে তারা পড়েছেন চরম সংকটে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এসব ধান দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের অনুপযোগী বলা হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীরাও এসব ধান কিনতে অনীহা প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ কিনলেও নামমাত্র দামে কিনছেন। এতে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, শ্রমের মূল্যও উঠছে না।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইটনার ধনু-বৌলাই নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার এবং চামড়াঘাটের মগড়া নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে অষ্টগ্রামের কালনী নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি। আবহাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসায় সামনে বৃষ্টি হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে।
কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, হাওরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৭১ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় কর্তন হয়েছে ৩৬ শতাংশ। তবে এরই মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে ১৩ হাজার ২শত ৮৭ হেক্টর জমির ফসল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার কৃষক।
অষ্টগ্রাম উপজেলা সদরের সোনাই দিঘির পূর্বপাড়া এলাকার কৃষক মো. আফরোজ আলী জানান, তার ১১ একর জমির পুরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “ঋণ মওকুফ করা না হলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।”
মসজিদজাম এলাকার কৃষক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “দু-দিন ধরে রোদ ওঠায় চারা গজিয়ে যাওয়া ধান শুকাতে পারছি। আবার আবহাওয়া খারাপ হলে ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত কার্যকর সহায়তা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তারা বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন। তাদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত বাকি ধান ঘরে তুলতে পারবেন এবং ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।