ভবিষ্যৎ জীবনে এ আই নিয়ে কুবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা
বাবলু দেব, কুবি প্রতিনিধি:
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুততম বিবর্তনের নাম 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা সংক্ষেপে এআই। শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সৃজনশীল কাজ, সকল ক্ষেত্রেই জয়জয়কার ধ্বনিত হচ্ছে এই প্রযুক্তির। এই প্রযুক্তির জোয়ারে যখন বদলে যাচ্ছে গ্লোবাল চাকরির বাজার, সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন হচ্ছে নতুনভাবে, তেমনি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে তৈরি করছে এক ধরনের অজানা শঙ্কা।
এআই এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, বাড়াতে পারে অতিরিক্ত যন্ত্রের প্রতি আসক্তি। এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাসেও এআই জাগরণ বেশ সাড়া জাগিয়েছে। ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়া থেকে শুরু করে লাইব্রেরি-সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে 'এআই'।
শিক্ষার্থীদের মতে, অটোমেশনের ফলে অনেক গতানুগতিক পেশা হুমকির মুখে পড়লেও, নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাকরির বাজারে প্রবেশের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা এআই'র কারণে বড়ো ধরনের প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
কথা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে। এআইকে কীভাবে জানার চেষ্টা করছে, বুঝার আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবহার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে।
এনিয়ে একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এআইএস) বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মিলন সূত্রধর বলেন,'পড়াশোনার বিষয় সহ বিভিন্ন অজানা বিষয় জানতে এআই এর ব্যবহার করি। তবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল যাতে না হয়ে পড়ি সেজন্য যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করি।
তিনি আরো বলেন, চাকরি জীবনে এআই ভালো-খারাপ উভয় প্রভাব ফেলতে পারে। এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যানালগ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেইসব কাজগুলো এআই ব্যবহার করে কম সময়ে করা যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের এআই টুল ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত এআই নির্ভরশীলতা সঠিক ফলাফল প্রকাশে সমস্যা হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে এআই ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।'
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিবা আফরোজ নিহা বলেন, 'আমার অ্যাকাডেমিক জীবন সহজ করতে এআই এর ভূমিকা ৫০ শতাংশ, এটি আমার অ্যাকাডেমিক জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। যে-কোনো কিছু জানার প্রয়োজনে এবং অ্যাসাইনমেন্ট বিষয়, প্রেজেন্টেশন স্লাইড তৈরি করতে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে।
এছাড়া তিনি অতিরিক্ত এআই নির্ভরশীলতার কারণে চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা জানিয়েছেন। তিনি এআই ব্যবহারের পাশাপাশি কমিউনিকেশন সহ প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন করার কথাও বলেন।'
ইফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুর রহিম বলেন, 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শিক্ষা, যোগাযোগ থেকে শুরু করে কেনাকাটা সব ক্ষেত্রেই এর উপস্থিতি মানুষের জীবনকে সহজতর ও গতিশীল করছে। বিশ্ব এখন পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে, যেখানে মানুষ ও এআই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরো বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এটি একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করছে। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলেও, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এআইকে ভয় না পেয়ে, একে সঠিকভাবে আয়ত্ত করা এবং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করাই হবে পঞ্চম শিল্প বিপ্লবে টিকে থাকার এবং এগিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি।'
কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসসি) বিভাগের শিক্ষার্থী তাসমিনা রহমান মাহিন বলেন, 'বর্তমান যুগে এআই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এর ওপর অতি-নির্ভরতা তরুণ প্রজন্মের নিজস্ব চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে নষ্ট করছে। প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন ঠিকই, তবে মানুষের উচিত নিজের মেধা ও সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিয়ে এআই-কে কেবল সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কল্যাণকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।'
এক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিদদের মতে, এআই-কে বাধা হিসেবে না দেখে একে 'টুল' বা হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তারা যেন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের মতো মানবিক গুণাবলি অর্জনে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা কোনো রোবট বা কোড দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
প্রসঙ্গত, ভবিষ্যৎ কর্মবাজার হবে মূলত "মানুষ ও যন্ত্রের সমন্বয়"। যারা এই পরিবর্তনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তারাই আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে থাকবে।