তীব্র গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন
আব্দুর রাব্বি হাসান ওয়ালিদ
গ্রীষ্ম মানেই উষ্ণতার ঋতু–এ কথা আমরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছি। কিন্তু আজকের গ্রীষ্ম আর আগের সেই পরিচিত গ্রীষ্মের মধ্যে তফাৎ রয়েছে। ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছে অস্বাভাবিকতা, সহনীয় উষ্ণতা রূপ নিয়েছে তীব্র দহনজ্বালায়। বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া আজ যেন এক অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। “তীব্র গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন”—এই বাক্যটি কেবল একটি কলামের শিরোনাম নয় বরং এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের ভাষা, ক্লান্ত মানুষের নিঃশ্বাস, শ্রমজীবী মানুষের ঘাম আর শহুরে জীবনের দমবন্ধ বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change)। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার সব মিলিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। সূর্যের তাপ পৃথিবীতে এসে প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও এখন তা বায়ুমণ্ডলে আটকে যাচ্ছে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষত বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ব্যাপক জনসংখ্যা ঘনত্ব এবং আর্দ্র জলবায়ু এই তিনটি উপাদান মিলে তাপদাহকে আরও অসহনীয় করে তুলছে। তাপমাত্রা যখন ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে তখন মানুষ অস্বাভাবিক গরম অনুভব করে। এই “হিট ইনডেক্স” বাস্তব তাপমাত্রার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। শহরাঞ্চলে এই তাপদাহের প্রভাব আরও তীব্র। “আরবান হিট আইল্যান্ড” নামে পরিচিত একটি প্রভাবের কারণে নগরজীবন যেন আরও বেশি দগ্ধ হয়ে ওঠে। ঢাকার মতো মহানগরে ইট বা কংক্রিটের দালান, পিচঢালা সড়ক এবং সবুজের অভাব সূর্যের তাপ শোষণ করে দীর্ঘসময় ধরে রাখে। ফলে দিনের গরম রাতেও পুরোপুরি না কমায় শহরের বাতাস ভারী ও দমবন্ধ হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যানবাহনের ধোঁয়া, কলকারখানার নির্গমন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার। মানুষ গরম থেকে বাঁচতে এসির আশ্রয় নিচ্ছে অথচ সেই এসিই পরিবেশে অতিরিক্ত তাপ ছড়িয়ে দিয়ে সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। এই বৈপরীত্য আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়—স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে আমরা অজান্তেই নিজেরাই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছি। তীব্র গরমের সবচেয়ে করুণ প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হিট এক্সহস্টশন, সানবার্ন ইত্যাদি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের তাপমাত্রা যখন বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যায় এবং শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ব্যর্থ হয় তখন হিটস্ট্রোক দেখা দেয়, দ্রুত চিকিৎসার অভাবে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষদের জন্য এই গরম বিশেষভাবে বিপজ্জনক। অন্যদিকে দিনমজুর, কৃষক, রিকশাচালক ও নির্মাণ শ্রমিকদের মতো মানুষরা প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে বাধ্য হন। তাদের জন্য গরম মানেই জীবনসংগ্রামের এক নির্মম অধ্যায়। জীবিকার তাগিদে তারা নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে কায়িক শ্রম করে যান, যা তাদের জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত এক কঠিন লড়াই। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তাপদাহের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কৃষি খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তীব্র গরমে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সেচের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, লাভ কমছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেলেও ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও পোলট্রি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যাচ্ছে, পোলট্রি খামারে মৃত্যুহার বাড়ছে—যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফ্যান, ফ্রিজ, এসিসহ বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট জিনিসের অতিরিক্ত ব্যবহার বাড়ার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অত্যাধিক চাপ পড়ে এবং লোডশেডিংয়ের সমস্যা দেখা দেয়। বিদ্যুতের এই ঘাটতি শুধু ঘরে নয়, শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। উৎপাদন ব্যাহত হয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি চাপে পড়ে। পরিবেশের ওপর তাপদাহের প্রভাব আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। নদী-নালা শুকিয়ে যাচ্ছে, খাল-বিলের পানি কমে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে পানির সংকট তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ এই তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তারা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনেও পড়ে, যেমন ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া, খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। প্রথমত, পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বিচারে বন উজাড় বন্ধ করতে হবে এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। গাছপালা পরিবেশকে শীতল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয়ত, টেকসই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শহরে সবুজায়ন বাড়াতে হবে, খোলা জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে এবং ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নকশা ব্যবহার করতে হবে। ছাদ বাগান ও সবুজ ছাদ তাপমাত্রা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। সৌরশক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প। এর মাধ্যমে একদিকে বিদ্যুৎ সংকট কমানো সম্ভব অন্যদিকে পরিবেশের ওপর চাপও কমানো যাবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা পোশাক পরা, তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা—এসব বিষয় সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পঞ্চমত, শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, বিশ্রামের ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সরবরাহ—এসব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ষষ্ঠত, গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তাপদাহের প্রকৃতি ও প্রভাব সম্পর্কে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন, যাতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়। সবশেষে বলা যায়, তীব্র গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন আমাদের সামনে এক গভীর সতর্কবার্তা তুলে ধরছে। প্রকৃতি আর অবহেলা সহ্য করছে না। এটি কেবল একটি ঋতুগত সমস্যা নয় বরং এটি আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অসামঞ্জস্যের প্রতিফলন। এখনই সময় আমাদের সচেতন হওয়ার, দায়িত্ব নেওয়ার এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সব পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। আমরা যদি আজ প্রকৃতিকে রক্ষা করি তবে প্রকৃতিও আমাদের রক্ষা করবে। অতএব, তীব্র গরমকে শুধুমাত্র একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হিসেবে না দেখে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা যদি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তুলতে পারি তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কলাম লেখক,
আব্দুর রাব্বি হাসান ওয়ালিদ
শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
ই-মেইল: arhwalid.100@gmail.com
মোবাইল: ০১৩২৩৬৩৪৫৫৬