ইচ্ছা আছিল ধান তুইল্লা খোড়াক রাইক্কা ধান বেইচ্চা কোরবানি দিমু,আর পূরণ করতাম পারলাম না
বিজয় কর রতন,হাওর অঞ্চল প্রতিনিধি: আজ ঈদ মনের মধ্যে কোন শাস্তি নাই । ইচ্ছা আছিল ঘরে ধান তুইল্লা, বছরের খোড়াক রাইক্কা,বাহি ধান বেইচ্চা, কোরবানি দিমু, হেই ইচ্ছা আর পূরণ করতাম পারলাম না। পুলাপাইনরে কেমনে ঈদের কাপড় কিইন্না দিমু। পানির তলে ক্ষেত অহনো ঘুমাইতাছে ।কিছু ক্ষেত কাটছিলাম । হেই ধানেও গ্যারা আইয়া পড়ছে। হুকাইয়া চাল করছিলাম ভাইঙ্গা গেছে । ভাঙ্গা চাল ২ মাস খাওন যাইবো। পরে যে কিতা খাইমু চিন্তা কইরা পাইনা। কিছু ঋন কইরা ৭ খানি ক্ষেত করছিলাম। ১ খানি ক্ষেত কাটছিলাম । ৬ খানি ওই অহন পানির তলে। এইবার কোরবানি ঈদের কোন যোগাড় নাই আমরার ঘরে । আত্নীয় স্বজনের বাড়ি থেইক্কা কোরবানির মাংস দিয়া গেছে । কথা গুলো বলছিলেন, মিঠামইনে নদার, বেচুরকোনা, নৌপোষা , হাওরের কৃষক ঘাগড়া গ্ৰামের রুবেল ও তোফাজ্জল মিয়া। তারা দুজনেই কথা গুলি বলতে গিয়া কান্নায় ভেংগে পড়েন । মিঠামইনের এই হাওরের কৃষকের ঘরে হাহাকার। হাওরের কৃষকদের দাবি ৬০ হাজার কৃষকের কষ্টের ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ।এ ধান দিয়ে সারা বছরের খোড়াক চলে । এই হাওরের অপর কৃষক ইসলাম উদ্দিন সে ৮ একর জমি চাষ করে ছিলেন, তার অধিকাংশ জমি এখনো পানির নিচে। কিছু আনলেও তা দিয়ে এক মাসের খোড়াক চলবে। কথা গুলি বলতে বলতে ইসলাম উদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, একমাত্র এই বছর ওই কোরবানি দিতে পারলাম না। আল্লা আমারে তৌফিক দেননি । আমি মেম্বার ছিলাম। ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করে লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট করেছি । আইজ ঈদের দিন আমার পরিবারে কোন আনন্দ নেই। পুলাপাইন সবুর মাইন্না বইয়া রইছে । বিভিন্ন তথ্য সুত্রে জানা যায়, মার্চের শেষ দিকে পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টি শুরু হয় ওজানে। এতে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্ৰামে ৫৫ টি হাওরের মধ্যে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন ধান পাকা শুরু হয়ে গেছে । কোন কোন জমি কাটার উপযোগী হলেও বৃষ্টির কারণে সঠিক ভাবে ধান ঘরে তুলতে পারেননি। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে টানা ভারি বৃষ্টিতে পুরো হাওরের নিচু জায়গার জমি তলিয়ে যেতে শুরু করে। ডুবে যায় কৃষকের কষ্টের ফসল।
সরকারি হিসেবে ১৩ হাজার হেক্টর ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু কৃষকের দাবি ২০ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যমতে,অতি বৃষ্টি ও অকাল বন্যার কারণে ৫০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রসাশন থেকে যাচাই বাছাই করে তালিকা আরো পূর্বেই ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। গত বুধবার ২৭ শে মে অষ্টগ্রামে মাননীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমান ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে নগদ অর্থ ও ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় দেওয়া হবে।
মিঠামইনের ঢাকীর হাওরের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, ধান তুইল্লা পরিবার লইয়া ঈদ করার কথা। অহন ধান হারাইয়া চিন্তায় পড়ছি , সারাবছর কেমনে চলমু। অপর কৃষক আলামিন সরকার বলেন, ঈদ আমরার কপালে নাই । ধানই নাই কোরবানি দিমু কইত্তে , কোরবানির টেহা থাহন লাগবো তো , ক্ষতির টেহা পাইলে ও তো কিছুডা জান বাঁচলো। মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি, এডভোকেট জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর বলেন, হাওরে ঈদের আনন্দ থাকার কথা। কোরবানির ঈদ একটি বড় ঈদ। কিন্তু এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারে চলছে আহাজারি ও নিরবতা। কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডাঃ সাদিকুর রহমান বলেন, জেলায় মোট ৫০ হাজার কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঈদের পরে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা গুলোতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে যাবে । এ বছর চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩ শত ৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ৩ শত ২৪ টন।