অষ্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় মৃত ও প্রবাসীদের নাম!
"আমরার ক্ষেত পানির তলে, লিষ্টে আমরার নাম নাই ,যারার ক্ষেত নাই এরার নাম আছে"
বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার ৮ টি ইউনিয়নে অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মোট ৬ হাজার ৪ জন। এদের মধ্যে প্রবাসী,মৃত ব্যক্তি ও কৃষক নন , জমি ও নেই এমন ব্যাক্তির নাম তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে কৃষক নন এমন ব্যাক্তির নাম রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। অষ্টগ্রামের বাঙালপাড়া ইউনিয়নের উসমানপুর গ্ৰামের মৃত ইসহাক মিয়া, পিতা মৃত হোসেন আলী , আইডি নং ৪৮১০২৩৫৭৬৩৮৮০ ।
এছাড়া অষ্টগ্রামের দেওঘর ইউনিয়নের আলী নগর গ্ৰামের অলি মিয়া, পিতা ইসাম উদ্দিন। তিনি একজন প্রবাসী। আইডি নং ৪৮১০২৪৭৭২২৬৫২ । একই ইউনিয়নের অপর প্রবাসী দেওঘর গ্ৰামের , তার নাম সোহেল আহমেদ, পিতা ধন মিয়া। আইডি নং ৫৫৫৩৮০৬১৬৬। এরকম অন্যান্য ইউনিয়নে একাধিক নাম রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় যাদের জমি নাই, প্রবাসে থাকেন, এমনকি মৃত ব্যক্তির নাম কীভাবে আসে কৃষকরা এ অভিযোগ করে বলেন, আমাদের জমি এখনো হাওরে পানিতে তলিয়ে রয়েছে, জমি কাটতে পারেনি। কিন্তু আমাদের নাম ক্ষতির তালিকায় নাই । নেতাদের নাম তাদের আত্মীয় স্বজনের নাম, এক পরিবারে তিনের অধিক সদস্যের নামও তালিকায় রয়েছে। তাদের কোন জমি নেই। ক্ষতিও হয়নি । এ সকল অভিযোগ করে লাভ নেই। কারণ, আমরা নিরীহ কৃষক, যারা রাজনীতি করে তাদের নামের দরকার, সাহায্যের দরকার। আমরা না খেয়ে থাকলে সরকারের কী? ভোটের সময় আইলে ভোট দিমু এইডাই তো আমরার কাম । ফেন শাট পিইন্দা লাইনে কারুইয়া সরকারি টেহা নে চাল নে । আমরা গামছা পিইন্দা খালি গায়ো ঘুরলেও আমরারে কেউ জিগাইতো না। সরজমিনে শনিবার সকালে অষ্টগ্রামের প্রত্যন্ত গ্ৰাম কলমা ইউনিয়নের সাপান্ত ,বাজরী,কাকরিয়া, জেলে পল্লীতে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হয় । তারা বলেন, আমার নাম জহরলাল দাস, আমার বাড়ি কলমা ইউনিয়নের সাপান্তর গ্ৰামে । তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ৫০ ক্ষের জমি করছিলাম, পানির তলে গেছে গা, কাইট্টা আনতাম পারছি না, কেমনে চলুম কিও খাইমু হেই চিন্তায় জান বাঁচে না।হুনছি সরকারে পানির তলের জমি লিষ্টি করছে, আমরার নাম লিষ্টিত দিছে না। অপর কৃষক কাকুরিয়া গ্ৰামের বৃদ্ধ অনিল দাস তিনি বলেন, ৩০ ক্ষের ক্ষেত করছিলাম সবই পানির তলে, খুব কষ্ট কইরা চলতাছি হাওরে এই পানির মধ্যে মাছ ও ধরতাম পারিনা । মধ্যে মধ্যে পানির তল থেইক্কা পঁচা ধান তুইল্লা আনি পেডের জ্বালায় । আমরার নাম লিষ্টিত নাই , আমরারে কেউ জিগাই না। সাপান্ত গ্ৰামের অপর কৃষক পরিমল দাস তিনি বলেন, ২০ ক্ষের ক্ষেত করছিলাম।সব পানির তলে, ডেডা পর্যন্ত আনতাম পারছি না। আমরার নাম দিবো নেতারার এই পেড ভরে না। এই গ্ৰামের পরমেশ্বর দাস বলেন,১০ ক্ষের ক্ষেত করছিলাম। সবই পানিয়ে লইয়া গেছে । সাহায্যের নামের লাগি কয়েকদিন ঘুরছি । নেতারা নাম দেয় না। কলমা ইউনিয়নের হালালপুর গ্ৰামের সুভাষ দাস তিনি ২০ ক্ষের জমি করছিলেন। তিনি বলেন, আমরার খবর কেউ লইনা। পানির তলে গেছে ধান কোন মেম্বার চেয়ারম্যান খোঁজ নিলো না। সরকারি সাহায্য আমরা পায়না লিষ্টিতে এই গেরামের অনেকের নাম নাই । আইডি কার্ড দিছি নাম কাইট্টা দিছে এরার পেড ভরলে এন্নে আমরারে দিতো । অহন কিছু করার নাই। পানি ভারলে হাওরে গিয়া মাছ মারমু । এছাড়া আমরার কোন পথ নাই। আমনেরা পেপারে দিলে কি হয়বো , সরকার এইডা পরতো না। গরিবের লাগি কোন সরকার নাই । এসকল হিন্দু পল্লীতে অসংখ্য কৃষক রয়েছে , যাদের নাম তালিকায় উঠেনি ।
সাপান্ত,কাকুরিয়া , হালালপুর , চন্ডিপুর , এলাকার জেলে পল্লীতে অনেক পরিবার নিঃশব্দে কেঁদে বেড়াচ্ছেন কিছু করার নেই।
অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ মজনু মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির, প্রবাসীদের নাম তালিকায় থাকলেও তারা সহায়তা পাবে না। আমরা যাচাই বাছাই করে এসকল নামের অর্থ বরাদ্দ দিবো । তালিকা কৃষি অফিসের মাঠ কর্মী ও নেতৃবৃন্দ করেছেন। এরপরেও আমরা সঠিক ভাবে যাচাই বাছাই করে অর্থ সহায়তা প্রদান করবো ।
অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পন্ডিতের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,৮ টি ইউনিয়নে মোট ৬ হাজার ৪ জন কৃষকের তালিকা অনুমোদন হয়েছে। কেউ বাদ পড়লে এখন আর করার কিছু নেই। সরকার যদি দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করার নির্দেশ দেয় তখন এসকল বাদ পড়া কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অধিকাংশ নাম রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দিয়েছেন তবে প্রবাসী, মৃত ব্যক্তি, ও একই পরিবারের একাধিক নাম তালিকায় থাকলে আমরা যাচাই বাছাই করে অর্থ ও চাল প্রদান করবো । প্রয়োজনে বরাদ্দকৃত অর্থ ও টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হবে। অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সিলভিয়া স্নিগ্ধার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যে কোন জরুরী বিষয়ে ওনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে যদি কোন সময় ফোন রিসিভ করেন এবং সাংবাদিক পরিচয় দিলে ফোনটি কেটে দেন । অষ্টগ্রামের স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, তিনি কোন সাংবাদিকের ফোন রিসিভ করেন না। যদিও কোন সময় করেন তখন উর্দ্ধতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কথা বলা যাবে না বলে এড়িয়ে যান ।