শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
সারাদেশ

জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইনে নাকাল কয়রাবাসী

অনলাইন ডেস্ক ০৬ June ২০২৬ · Saturday · ০৯:০৮ অপরাহ্ণ
জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইনে নাকাল কয়রাবাসী


‎                                    

‎বিদ্যুতের ঘাটতি নেই, তবুও প্রতিনিয়ত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন কয়রা
‎                                           

‎এসকে এম মহসিন রেজা
‎উপজেলা প্রতিনিধি (খুলনা) 

‎খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি না থাকলেও প্রতিনিয়ত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। সামান্য বাতাস কিংবা বৃষ্টি হলেই সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। ঈদকে সামনে রেখেও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও কৃষি কাজে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। 

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে পুরানো সঞ্চালন লাইনের একই সমস্যার কথা শুনলেও বাস্তবে কোনো স্থায়ী সমাধান চোখে পড়ছে না। বিশেষ করে সামান্য ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টি হলেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। সম্প্রতি কয়েকবার বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করে প্রতিবাদের ঘটনাও ঘটেছে। 

‎সম্প্রতি কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের স্বজনরা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো। রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের পাশাপাশি টয়লেটে পানির কষ্টও পেতে হচ্ছে।

‎কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেছেন, “হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মূল ভবন না থাকায় জেনারেটর সুবিধা নাই। বিকল্প হিসেবে অন্ত:বিভাগে আইপিএস ব্যবস্থা চালু করি, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক সময় একটানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। তখন আইপিএসের ব্যাটারি পুনরায় চার্জ হয়ে ব্যাকআপের সুযোগ পায় না।”

‎শুধু হাসপাতাল নয়, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষও। দেয়াড়া গ্রামের গৃহবধূ শামীমা খাতুন বলেছেন, “কোরবানির মাংস ফ্রিজে রেখে দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মাছ-মাংস নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। তীব্র গরমের মধ্যে শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে।”

‎বেদকাশির ফুলতলা গ্রামের শাহারুল ইসলাম জানান, লাইন ঠিক করার জন্য প্রতি সপ্তাহে দুই দিন সকাল ৭ টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। এছাড়া সামান্য বাতাস হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। কোন কোন সময় ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পরেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয় না। আবার সরবরাহ করা হলেও লো-ভোল্টেজ এর ফলে শান্তি নাই। রাতে ভোল্টেজ এত কম থাকে যে ফ্যানের পাখা ঘোরে না। তীব্র গরমে আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

‎ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরাও।মহারাজপুর ইউনিয়নের বেড়ের খাল ব্রীজ এলাকার চায়ের দোকানদার মুজাহিদ জানান, “চা-পান বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করি। গরিব মানুষ, গ্যাস কিনতে না পেরে হিটারে চা তৈরি করি। বিদ্যুৎ না থাকলে চা বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ না থাকলে ক্রেতাও কমে যায়।”

‎কয়রা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে এন্ড কফি শপের
‎স্বত্বাধিকারী মো: জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাষ্য, ঈদকে কেন্দ্র করে তার জমজমাট ব্যবসা হয়। তবে এবার দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তার ব্যবসায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

‎বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো, কয়রা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বিদ্যুৎ এখন বিলাসিতা নয়, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অপরিহার্য উপাদান। অথচ কয়রার মানুষ বেশ কয়েকবছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেনা। প্রতিনিয়ত তারা অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করছে। একটি জনপদের মানুষকে বছরের পর বছর এমন ভোগান্তির মধ্যে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

‎উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, “কয়রার মানুষ বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ সমস্যার ভোগান্তি পোহাচ্ছে। পুরানো সঞ্চালন  লাইন ও ৩৩ কেভির গ্রীডের একই অজুহাত শুনতে শুনতে কয়রার মানুষ ক্লান্ত। সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি দৃশ্যমান। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে হাসপাতালের রোগী, শিক্ষার্থী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ তাদের মাথাব্যথা নেই। দ্রুত স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

‎এ বিষয়ে খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন কয়রা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. মাহফুজুর রহমান খাঁন বলেন, “বর্তমানে কয়রায় কোনো লোডশেডিং নেই। তবে উপজেলার সঞ্চালন লাইনটি সাতক্ষীরার ৩৩ কেভি লাইনের সঙ্গে যুক্ত, যা প্রায় ৩০ বছর আগের পুরোনো। সামান্য বাতাস হলেই লাইনের ইনসুলেশন নষ্ট হয়ে যায়। দুর্গম এলাকায় ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামত করতে সময় লাগে। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়।”

‎উপজেলার উত্তর বেদ কাশী ইউনিয়নের কাটকাটা গ্রামের বাসিন্দা ডি এম তাজমিরুল ইসলাম জানান, খুলনার লাইনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন না করা পর্যন্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য পাইকগাছায় একটি গ্রিড নির্মাণের কাজ চলছে। তবে নতুন সংযোগ ও লাইন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

‎উপকূলীয় এই জনপদের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

উখিয়ায় দন্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে যাচ্ছে এলিট ডেন্টাল কেয়ার

উখিয়ায় দন্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে যাচ্ছে এলিট ডেন্টাল কেয়ার

সিরাজুল কবির বুলবুল, উখিয়া প্রতিনিধি। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত চিকিৎসা সেবায় ইতি...

০৬ June ২০২৬ · Saturday · ০৯:০৬ অপরাহ্ণ
পাবনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‍্যালি, লিফলেট বিতরন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে

পাবনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‍্যালি, লিফলেট বিতরন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে

 মো: আরিফুল ইসলাম,পাবনা জেলা প্রতিনিধি।গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ ব...

০৬ June ২০২৬ · Saturday · ০৯:০৩ অপরাহ্ণ
দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু

দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু

 সামরুল হক, স্টাফ রিপোর্টার:জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ঢাকাগামী ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্র...

০৬ June ২০২৬ · Saturday · ০৯:০১ অপরাহ্ণ