কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে রোগীর স্বজনকে রুমে আটকে মারধরের অভিযোগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং হাসপাতালের স্টাফদের দিয়ে মারধর করানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকে হাসপাতালজুড়ে চরম উত্তেজনা ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগের ১৩৭ নম্বর কক্ষে এই ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী মো. উবায়দুল্লাহ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কলাদিয়া ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের আব্দুস বাছেদের ছেলে।
এই ঘটনায় তিনি কিশোরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ইসরাত জাহান মৌ।
তিনি কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।
তিনি জেলা শহরের গাইটাল শ্রীনগর এলাকার ইদ্রিস আলীর মেয়ে এবং ব্যক্তিগতভাবে জেলা শহরের আওয়ামী লীগ অফিসের পিছনে “ডা. ইসরাত জাহান মৌ স্কিন অ্যান্ড লেজার কেয়ার সেন্টার” নামক একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে মো. উবায়দুল্লাহ তার অসুস্থ স্ত্রী ও আট মাস বয়সী শিশুসন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। নির্ধারিত চিকিৎসকের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি উপস্থিত না থাকায় তিনি বিষয়টি নিয়ে ভিডিও ধারণ করেন এবং অন্যান্য রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর চিকিৎসকের সহকারী বিষয়টি চিকিৎসককে অবহিত করলে প্রায় সকাল ১১টার দিকে তিনি কক্ষে উপস্থিত হন।
পরে উবায়দুল্লাহ চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করলে সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় চিকিৎসক তার পরিচয় এবং ভিডিও ধারণের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ভিডিও মুছে ফেলতে চাপ দেন। পরে চিকিৎসকের নির্দেশে হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ তাকে ঘিরে ধরে মারধর করেন বলে ভুক্তভোগী দাবি করেন। একই সঙ্গে চিকিৎসক নিজেও তার জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন এবং গলা চেপে ধরেন।
ঘটনার সময় তার অসুস্থ স্ত্রী ও আট মাস বয়সী শিশুসন্তান উপস্থিত ছিল এবং তারা কান্নাকাটি করতে থাকে। পরে বাইরে থাকা লোকজন এগিয়ে এলে কক্ষের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তিনি সেখান থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, হঠাৎ করেই চিকিৎসকের ১৩৭ নম্বর কক্ষের ভেতর উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কক্ষের ভেতর থেকে উচ্চস্বরে তর্কবিতর্ক ও মারধরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এতে বাইরে থাকা সাধারণ রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। কিছু সময় পর দরজা খোলা হলে একজন ব্যক্তিকে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও উত্তেজিত অবস্থায় ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ডা. ইসরাত জাহান মৌয়ের বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব অবহেলা করে নিজের ব্যক্তিগত “স্কিন অ্যান্ড লেজার কেয়ার সেন্টারে” রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার পুরোনো ও অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ ও দরিদ্র রোগীদের নানামুখী ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তার করে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। আর তার এই নির্দেশ বা পরামর্শ না শুনলে রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর ও খারাপ আচরণ করেন বলেও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
এই ঘটনার পর কিশোরগঞ্জের সচেতন মহল এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে যদি সাধারণ মানুষ এবং তাদের পরিবার এভাবে হেনস্তা ও মারধরের শিকার হয়, তবে সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। তারা অবিলম্বে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করে দোষী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ইসরাত জাহান মৌ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “অভিযোগকারী উবায়দুল্লাহ হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং সিরিয়াল অমান্য করে জোরপূর্বক আমার কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় কক্ষে থাকা অন্যান্য রোগীদের সঙ্গেই তার বাকবিতণ্ডা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “তিনি প্রথমে আমার সাহায্যকারীকে এবং পরে আমাকেও ধাক্কা দেন। আমার বিরুদ্ধে মারধর, কলার ধরা বা গলা চেপে ধরার যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি হাসপাতালে নিয়মিত ও নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করি।”
জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা: নাজমুল করিম বলেন, “এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, এ ঘটনায় আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেব"।
কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূর মো. শামসুল আলম বলেন, সিভিল সার্জন ফোন দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলেছে।
আজ রোববার (১৪ জুন) ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।