অষ্টগ্রামে মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা না হলেও দখলদারদের ব্যবসা জমজমাট
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
চারপাশে সারি সারি টিনের দোকান। ক্রেতাদের উপস্থিতিতে চলছে জমজমাট বেচাকেনা। ভালো করে দেখলেই বুঝা যায়, দোকান গুলোর মাঝে দাঁড়িয়ে পুরোনো দোতলা ভবন। তবে জানালা দরজা নেই। সরজমিনে ভেতরে গিয়ে দেখা মেলে দেয়ালের অংশ খসে পড়েছে। রড বেরিয়ে আছে মরিচা পরা। ভবন জুড়ে ময়লার ভাগার। অথচ একসময় এটি লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার মূল ভরসা ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে আর মামলার কারণে এমন বেহাল অবস্থা অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুরের মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের।সরজমিনে শুক্রবার (২৮ মার্চ) দুপুরে অষ্টগ্রামের আদমপুর বাজারে গেলে এ দৃশ্য চোখে পড়ে।
জানা যায়,কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নে ১৯৬৫ সালে ৪২ শতাংশ জায়গা নিয়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি চালু হয়। তবে প্রায় ২০ বছর যাবত সেখানে চিকিৎসা না হওয়ায় দখল করে ব্যবসা করেছেন প্রভাবশালীরা। জানা গেছে ,চিকিৎসা কর্মকর্তা মোঃ শিবির আহমেদ অবসরে যাওয়ার পর আর কেউ কেন্দ্রের দায়িত্বে আসেননি। তাই দোকান বসিয়ে ব্যবসা করেছেন দখলদাররা। এতে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকজন প্রথমে অস্থায়ী ভাবে ব্যবসা শুরু করেন। পরে স্থায়ী দোকান বসিয়ে ব্যবসা করেছেন তারা।
স্থানীয়রা বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে হাওড়অঞ্চল আদমপুর ইউনিয়নের দূরত্ব, স্থল ও নৌ-পথে প্রায় ২০ কিলোমিটার। দুর্গম পথ হওয়ায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। পাশের আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সেখান থেকে মানুষ আদমপুরে আসতেন চিকিৎসা নিতে। অথচ কেন্দ্রটিতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি না থাকায় দখল হয়ে গেছে, ভবনের ভেতরে আবর্জনায় ভরা। মানুষের মলত্যাগের কারণে ভেতরে দুর্গন্ধে যাওয়া যায় না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কামরুল হাসান মহসিন, রাসেল মিয়া, মজিবর মিয়া, কেবল মিয়া, বুলবুল মিয়া, সোহেল মিয়া, মোহম্মদ মিয়া, মিজান মিয়া, শওকত আলী, বলেন , সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুল করিম বাদলকে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে ভাড়া দেন তারা। অনেকে নিজ উদ্যোগে ঘর তুলে ব্যবসা করেছেন। তারা কাউকে ভাড়া দেন না।
এ বিষয়ে ফজলুল করিম বাদল বলেন ,৪২ শতাংশ জায়গা সরকারের নামে মাঠ জরিপে আছে। তাদের কেনা ৩ শতাংশ জায়গা নিয়ে মামলা চলছে। সরকার চাইলে তিনি দিতে রাজি আছেন। দখলদাররা দোকান তুলে ব্যবসা করছেন। একটি পক্ষ ১৭ শতাংশ জায়গা আদালতের রায়ে ভোগদখল করছে। কেন্দ্রটি বেদখল হলে রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা রইস উদ্দিন(৭৫) বলেন ,আগে তারা সবাই চিকিৎসা পেয়েছেন কেন্দ্রটি থেকে। এখন অষ্টগ্রাম, হবিগঞ্জ বা কিশোরগঞ্জে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্ষায় নৌকায় আর শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে ও ছোট বাহনে গিয়ে চিকিৎসা নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি জানালেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। আদমপুর ইউনিয়নের যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হারিস মিয়া জানান, মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালটি পরিত্যক্ত থাকায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের এলাকার সাধারণ রোগীদের ভোগান্তির চরম পর্যায় ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। একজন ব্যাক্তি বা শিশুর প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে গেলেও যেতে ৫০ কিমি রাস্তা পাড়ি দিয়ে হবিগঞ্জ জেলা সদরে যেতে হয়। যার সর্বনিম্ন খরচ হয় ২থেকে ৩হাজার টাকা।
আদমপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মোন্নাফ বলেন, আদমপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলেও কর্তৃপক্ষের কোন দৃষ্টি নেই। এবং বিগত দিনে সংসদ সদস্যকে জানালে তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি প্রভাবশালী মহলের কারণে উদ্যোগ নিতে পারেননি।
মানুষ নিরুপায় হয়ে চিকিৎসার জন্য হবিগঞ্জ যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ ও হয়রানির শিকার হতে হয়। কেন্দ্রটি চালু হলে আশপাশের মানুষও সুবিধা পেত।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রবীন বিশ্বাস জানান, কেন্দ্রটির জায়গা প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় মামলা চলছে। আদমপুরে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউবি) দেয়া হবে। অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধা বিষয়টি অবগত নন। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মাহবুবুর রহমান জানান,এ বিষয়ে আমি অবগত নই।খোজ খবর নিয়ে দেখতেসি।
এদিকে আদমপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি এখনো পরিত্যক্ত ঘোষণা হয়নি। মামলা রায় পেলে অবৈধ ব্যবসায়ীদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে। আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ভবন হয়েছে।সেখানেও এখন পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা চালু হয়নি।
মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।