ধর্মীয় শিক্ষায় চরম গড়িমসি,কালাইয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে বিস্তর অভিযোগ
মোঃ মোকাররম হোসাইন,কালাই(জয়পুরহাট)প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুতর অনিয়ম, তদারকির অভাব এবং দায়িত্বহীনতার অভিযোগে পুরো ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত এই কর্মসূচিতে কাগজে-কলমে ১২৭টি শিক্ষাকেন্দ্র চালু থাকলেও বাস্তবে অনেক কেন্দ্রেই পাঠদান কার্যক্রম নেই,আবার কোথাও নিয়ম ভেঙে নামমাত্র শিক্ষা কার্যক্রম দেখিয়ে মাস শেষে নিয়মিত বেতন উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে,এসব কেন্দ্রের শিক্ষকদের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৬ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও তার প্রতিফলন শিক্ষার মান বা উপস্থিতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়,উপজেলায় ৩৮টি মসজিদভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র, ৮৮টি সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র এবং একটি বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে।নিয়ম অনুযায়ী প্রাকপ্রাথমিক কেন্দ্রে ৩০ জন,সহজ কোরআন কেন্দ্রে ৩৫ জন এবং বয়স্ক কেন্দ্রে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সংখ্যার অর্ধেকও পাওয়া যায় না।অনেক কেন্দ্রে ১০ জনের কম শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, আবার পুরনো শিক্ষার্থীদের নাম হাজিরা খাতায় দেখিয়ে উপস্থিতি পূরণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরজমিনে উপজেলার একটি পৌরসভা ও পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন শিখুন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কোথাও নির্ধারিত শিক্ষার্থীসংখ্যা নেই, কোথাও আবার মসজিদের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বাড়িতে কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।উপজেলার প্রায় সবগুলো কেন্দ্রেই ৩০ জনের স্থলে মাত্র ৮/১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করতে দেখা যায়।স্থানীয়রা জানান, অনেক সময় শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না,আবার থাকলেও পাঠদানের পরিবর্তে গল্পগুজবেই সময় পার করেন শিক্ষকরা।
মাত্রাই ইউনিয়নের ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী শিউলি আক্তার জানায়,আমরা প্রতিদিন সকালে কেন্দ্রে যাই,কিন্তু অনেক দিন স্যার আসেন না। আবার কখনো আসলেও কিছুক্ষণ বসে রেখে তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দেন।একই অভিযোগ করেন জিন্দারপুর ইউনিয়নের আরেক শিক্ষার্থী রাকিব জানায়,আমরা কোরআন শেখার জন্য যাই, কিন্তু ঠিকমতো শেখানো হয় না।
অভিভাবকদের ক্ষোভ আরও স্পষ্ট। স্থানীয় অভিভাবক সাইফুল ইসলাম ও জুবায়ের হোসেন বলেন,সরকার ভালো উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করেন না অথচ নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন।এটা বন্ধ হওয়া দরকার।আরেক অভিভাবক রেহানা বেগম বলেন,আমরা সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতে চাই কিন্তু এমন অবহেলা থাকলে তারা কিছুই শিখবে না।
অভিযোগ উঠেছে, কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রের অবস্থান ও নাম পরিবর্তন করে কাগজে-কলমে চালু দেখানো হচ্ছে।হেনা কবির নামে এক শিক্ষকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাকে আতাহার সরদারপাড়া গ্রামে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই কেন্দ্রের অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় বাসিন্দা মফিজউদ্দিন বলেন,এই কেন্দ্রটি এক বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে,কিন্তু এখনো সেখানে শিক্ষক দেখিয়ে বেতন তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,আতাহার শিক্ষা কেন্দ্রে বয়স্ক লোকজন আর না আসার কারণে লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে এখন জিন্দারপুর ইউনিয়নের করিমপুর মধ্যপাড়ার কেন্দ্রে নিয়োগ দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অবশ্য কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক ও সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক মাওলানা রফিকুল ইসলাম ও মামুনুর রশীদ বলেন, আমরা শিক্ষক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি। তবে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আসে না, যা শিক্ষাদানে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে, যা সমাধান করা প্রয়োজন।
এ অবস্থার জন্য উপজেলার ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে তদারকিতে অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা ও অর্থের বিনিময়ে অনেক শিক্ষককে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ,দীর্ঘদিন ধরে সঠিক তদারকি না থাকায় অনিয়মের মাত্রা বেড়েই চলেছে। পক্ষপাতমূলক আচরণ,দায়িত্বে গাফিলতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো কার্যক্রমই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপার ভাইজার গোলাম রব্বানী বলেন,আমি গত ডিসেম্বরে এখানে যোগদান করেছি।তারপর রোড এক্সিডেন্ট করে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলাম।ভালভাবে চলাফেরাও করতে পারছি না।তাই আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়।তবে ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি শামীম আরা বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমে তদারকির ঘাটতি ও অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।তিনি জানান, বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হবে। কোনো অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা বা অর্থের অপচয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জয়পুরহাট জেলার ইসলামি ফাউন্ডেশনের ফিল্ড অফিসার মোঃ মোত্তাকিনুল ইসলাম বলেন, কালাই উপজেলার সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর অভিযোগের বিষয়ে সবেমাত্র অবগত হলাম।ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম, অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা বরদাস্ত করা হবে না।যারা দায়িত্ব পালন না করে সরকারি অর্থের অপচয় করছেন বা শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।