আগাম পানির শঙ্কায় নিকলীর হাওরে অর্ধপাকা ধান কাটছেন কৃষক
আল-আমিন হাসান : নিকলী উপজেলা প্রতিনিধি
হাওরের জীবন মানেই প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান—কখনো আশীর্বাদ, কখনো আবার নির্মম বাস্তবতা।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে এখন সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি স্থানীয় কৃষকেরা। ধান পাকার আগমুহূর্তে আগাম পানি বৃদ্ধির শঙ্কা দেখা দেওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
নিকলী একটি হাওরবেষ্টিত উপজেলা, যেখানে বছরের প্রায় ছয় মাস কৃষিকাজ আর বাকি সময় মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয়রা। “মাছে-ভাতে বাঙালি”—এই পরিচয়ের সবচেয়ে বাস্তব প্রতিফলন মেলে এখানকার মানুষের জীবনধারায়। কৃষি ও মৎস্য—এই দুইয়ের ওপরই টিকে আছে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি।
ধান রোপণের শুরু থেকেই কৃষকের মনে থাকে একটিই আশা—সারা বছরের পরিশ্রমের ফল ঘরে তোলা। জমিতে বীজ বোনা থেকে শুরু করে পরিচর্যার প্রতিটি ধাপে তারা লালন করেন একটি স্বপ্ন—সোনালি ধান ঘরে তুলে পরিবারে স্বস্তি ফেরানোর স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নই বারবার ভেঙে যায় প্রকৃতির অনিশ্চিত আচরণে। ধান পাকার সময় ঘনিয়ে এলেই হঠাৎ করে আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হয়। আকাশে জমে কালো মেঘ, বাড়তে থাকে নদ-নদীর পানি। এতে হাওরে আগাম প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়, যা কৃষকের সব হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই শঙ্কা কাজ করছে কৃষকদের মধ্যে। হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পানি বাড়ার আভাস দেখা যাচ্ছে। ফলে জমিতে পানি ঢুকে পড়ার আগেই অনেক কৃষক বাধ্য হচ্ছেন অর্ধপাকা ধান কেটে ফেলতে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধান পুরোপুরি পাকার আগেই কাটতে হলে ফলন কমে যায়, দানার গুণগত মানও কম থাকে। এতে করে বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। ফলে কৃষককে লোকসান গুনতে হয়।
নিকলীর এক কৃষক বলেন,
“অনেক কষ্ট করে ধান চাষ করি। কিন্তু পানি বাড়ার ভয় থাকায় আগেই কেটে ফেলতে হয়। এতে ফলন কম হয়, খরচই ঠিকমতো উঠে না।”
অর্ধপাকা ধান কাটার ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকের আর্থিক ক্ষতি বেড়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষকই মৌসুমের শুরুতে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত ফলন না হওয়ায় সেই ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংসারের দৈনন্দিন খরচ, খাদ্য নিরাপত্তার চাপ—সব মিলিয়ে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। প্রায় প্রতি বছরই আগাম পানি বৃদ্ধির কারণে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
কৃষক ও স্থানীয়দের দাবি—
আগাম পানি বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিবছরের এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই নিকলীর মানুষ বেঁচে আছেন যুগের পর যুগ। তবে আধুনিক সময়ে এসে তারা চান এই লড়াই কিছুটা হলেও সহজ হোক।
সময়ের আগে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে শুধু কৃষকের স্বপ্নই নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও রক্ষা পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা হাওরপাড়ের মানুষের।