অপরিকল্পিত শিল্পায়নে সংকটে আশুলিয়া ও সাভার শিল্পাঞ্চল, বিপর্যস্ত জনজীবন
(ঢাকা জেলা প্রতিনিধি- নারয়ন সরকার সবুজ)
দ্রুত শিল্পায়নের চাপে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণে গভীর সংকটে পড়েছে আশুলিয়া ও সাভার। পরিবেশ দূষণ, তীব্র জলাবদ্ধতা, অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ বসতি ও ভঙ্গুর অবকাঠামো ও বহুমাত্রিক এই সমস্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ঢাকার অদূরের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চলের জনজীবন।
গত দুই দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাপক বিস্তারের ফলে আশুলিয়া ও সাভারে গড়ে উঠেছে শত শত কারখানা, শ্রমিক কলোনি ও বহুতল ভবন। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই শিল্পায়ন ঘটেছে প্রায় পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে। ফলে গ্রামীণ জনপদগুলো দ্রুত ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চলে রূপ নিলেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি সড়ক, ড্রেনেজ বা নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় কেমিক্যালযুক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি খাল-বিল ও তুরাগ নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে একসময়কার জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ জলাশয়গুলো মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। মাছের উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর কারণে স্থানীয় মানুষের পুষ্টি ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দূষিত পানি কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে ফসল উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
অপরদিকে, অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কজুড়ে তৈরি হয় হাঁটুসমান পানি। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন এমনমকি কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এতে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজার হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কর্মস্থলে পৌঁছাতে দেরি, যানবাহন সংকট এবং নোংরা পানিতে চলাচলের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্য সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
জামগড়া এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আগে এখানে মাছ ধরতাম, ধান চাষ করতাম। এখন বাতাসে দুর্গন্ধ, রাস্তায় হাঁটা দায়। উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই শান্তি আর নেই।
এদিকে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত শ্রমিক আবাসন ও সেমি-পাকা বসতি। এসব স্থাপনার অনেকগুলোরই নেই অনুমোদন, নেই যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। সরু গলি ও অপর্যাপ্ত প্রবেশপথের কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ইউনিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। কারখানার বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে কৃষি ও মৎস্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্বল ড্রেনেজ ও সরু সড়কের কারণে শ্রমিকদের নিত্যদিনের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। তিনি পরিকল্পিত শিল্পায়ন, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খান নঈম বলেন, পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নদী-নালা, খাল-বিল দখল ও দূষণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সব ধরনের স্থাপনা বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ নিশ্চিত করা জরুরি।
ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার প্রণব চৌধুরী জানান, দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় জরুরি সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সরু রাস্তা ও ঘনবসতির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঝুঁকিতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশুলিয়ার এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।
এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আশুলিয়াকে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পাঞ্চলে রূপ দেওয়া সম্ভব এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।