আগাম পানিতে হাওর প্লাবিত, নিকলীতে পানির মধ্যেই ধান কাটছেন কৃষকেরা
আল-আমিন হাসান : নিকলী উপজেলা প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার হাওরাঞ্চলে অকাল বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে পাকা ও অর্ধপাকা বোরো ধান ডুবে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্রুত পানি বৃদ্ধির কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে পানির মধ্যেই দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন। তবে শ্রমিক সংকট, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
নিকলী উপজেলা একটি হাওরবেষ্টিত কৃষিনির্ভর এলাকা।
এখানকার মানুষের জীবিকা মূলত বোরো ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। বছরের একটি মৌসুমেই তারা মূল ফসল উৎপাদন করেন, যা দিয়ে সারা বছরের সংসার চলে। ফলে এই ফসল হারানো মানেই পুরো বছরের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়া।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, একজন কৃষক বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে এই ফসল ফলান। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে তারা মাঠে কাজ করেন। একজন কৃষকের পরিশ্রমকে তারা অনেকেই একজন গর্ভধারিণী মায়ের সন্তানের জন্য দীর্ঘ সময় কষ্ট সহ্য করার সঙ্গে তুলনা করেন।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি তাদের সেই স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
বর্তমানে আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে আছে। টানা ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলের কারণে ধনু ও ঘোড়াউত্রা নদীসহ আশপাশের জলাশয়ের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে হাওরের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে অনেক ধানক্ষেত ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে।
এ অবস্থায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আগাম অর্ধপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন। তারা বলছেন, পানি আরও বাড়লে পুরো ফসলই পানির নিচে চলে যাবে—এই আশঙ্কায় সময়ের আগেই ধান কেটে নেওয়া হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে শ্রমিক সংকটে। কৃষকেরা জানান, এক হাজার টাকার বেশি মজুরি দিয়েও ধান কাটার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা পাওয়া যাচ্ছে, তারাও টানা বৃষ্টির কারণে নিয়মিত কাজে নামতে পারছেন না।
ফলে অনেক কৃষক নিজেরাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পানির মধ্যে নেমে ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।
একজন কৃষক জানান, “ধান কাটার সময় এখনই, কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আছে তারাও বৃষ্টির কারণে আসতে পারছে না।”
অন্যদিকে কাটা ধান শুকানোর ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় ধান ঠিকভাবে শুকানো যাচ্ছে না। এতে ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে গেছে। একদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে মান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন কৃষকেরা।
হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে এখন একটি সাধারণ দৃশ্য—কোমর বা হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে কৃষকেরা ধান কাটছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা চেষ্টা করছেন অন্তত কিছু ফসল ঘরে তুলতে।
দিন শেষে কৃষকেরা এখন সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছেন। তারা দ্রুত পানি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে চলতি মৌসুমে নিকলীর হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানি ঘটতে পারে, যা পুরো এলাকার কৃষি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।