"২০ হাজার টেহা খানি পচা ধান কাডাইয়া কি করমু , পানির তলে রয়ছে পইরা থাকুক , মাছে খাইবো নে “
বিজয় কর রতন,হাওর অঞ্চল প্রতিনিধি:
"২০ হাজার টেহা খানি পচা ধান কাডাইয়া কি করমু, পানির নিচে রয়ছে পইরা থাকুক, মাছে খাইবো নে " সমিতির বেডা ঘুরতাছে আইলে কি কমু । কথা গুলো বলছিলেন, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কুমারদিঘা হাওরের কৃষক নিরঞ্জন দাস । শুক্রবার ৮ ই মে হাওরে জমি থেকে আসার সময় রাস্তায় দেখা হয় তার সাথে। কথা বলতে বলতে বাড়ি চলে আসে । সে বলে , আমি কুমারদিঘা হাওরে ১ একর ২৫ শতাংশ জমি বন্ধক রেখেছিলাম। সেই জমি এ বছর চাষ করেছি । এক ধারে জমি পাকছে অন্য ধারে বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে আমার জমি অহন ১ হাত পানির তলে । রোইদ উঠলে কি হয়বো, পানি তো কমতাছে না। পানির তলে পচা ধান কাইট্টা আনলে দাউয়াল রে ( দেশীয় শ্রমিক) কে ২৫ হাজার টেহা দেওন লাগবো। পল্লী বিকাশ সমিতি থেইক্কা ৭০ হাজার টেহা ঋন লইছি। ক্ষেত করতে ৬০ হাজার টেহা গেছে। অহন যে অবস্থা ২৫ হাজার টেহার ধানই পাইতাম না। মা গঙ্গারে দিয়া আইয়া পড়ছি। কই থেইক্কা সমিতির ঋন দিমু, খাইমু ,চলমু , কেমনে হেয় চিন্তায় অহন আর বালা লাগে না। পুলাডা এইবার মেটিক পরিক্ষা দিতাছে । কতগুলো বলছিলেন তার নিজ ঘরের সামনে বসে দিনমজুর নিরঞ্জন দাস। তিনি খলাপাড়া আশ্রমে জায়গা নিয়ে ঘর তুলে বসবাস করছেন। নিজের জায়গা জমি নেই। একমাত্র ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছেন কষ্ট করে। ছেলের নাম গোবিন্দ দাস। সে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। গোবিন্দ স্থানীয় বাজারে ওর্য়াকসপের দোকানে কাজ করে তার বাবাকে সহায়তা করে। নিরঞ্জন সারাবছর অন্যের কাজ করে সংসার চালায়। এখন কাজ করে সমিতির লোন কীভাবে শোধ করবে সেই চিন্তায় অস্থির। তার আশা ছিল জমিতে ১০০ মন ধান হবে। ধান বিক্রি করে সমিতির লোন শোধ করবে। আর বাকি ধান সারা বছরের খোড়াক হবে। এখন সে দিশেহারা। প্রতিদিন রোদ উঠলেই হাওরে পানি কমার আশায় জমির পাশে বসে থাকেন। মিঠামইনে ঘাগড়া গ্ৰামের কৃষক তোফাজ্জল মিয়া জানান,নৌপোষা হাওর, ফোরদিঘার হাওর ও বেহারকোনা হাওরে ২১ খের জমি করছিলেন। মাত্র ১২ খের জমি কাটা হয়েছে। বাকি ৯ খের জমি পানির নিচে ১০ দিন যাবত তলিয়ে রয়েছে। ঘাগড়া গ্ৰামের পাশে ধানের খলায় গেলে কথা হয় তোফাজ্জল মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, আমার ২১ খের ক্ষেতের মধ্যে ১২ খের কাটছি । কাডা ধানে পানিতে গ্যাজ উঠেছে। ধানের কিনার বেপারি ও নাই । গ্যাজা ধান কেউ কিনে ও না । আইজ রোইদ উঠছে , গ্যাজা ধান লাইড়া দিছি । ১২ খের ক্ষেতে ধান হয়লে আড়াইশো মন হয়তো অহন শুকাইয়া খালি ৫০ হয়বো কিনা জানিনা। ব্রাক সমিতির থেইক্কা ১ লাখ টেহা ঋন লইছিলাম । জমি করতে খরচ গেছে ২ লাখ । সমিতির ঋন কেমনে দিমু ,কি খাইমু হেয় চিন্তায় রাইতে ঘুম হয়না । বাকি ক্ষেত পানির তলে। কাটতে গেলে দিগুন টেহা লাগবো । যে ধান পাইমু পচা তা বেচলে, বাড়িত আনার খরচের টেহা হয়তো না। আশে পাশের ধানের খলায়, এমন অসংখ্য ধানের স্তূপে গ্যাজ আসতে দেখা গেছে । এসকল হাওরে কৃষকদের দাবি অনুযায়ী বর্তমানে এখনও ৪০ ভাগ ধানের জমি পানিতে তলিয়ে রয়েছে। যেসকল ধান কাটা হয়েছে তার মধ্যে অর্ধেক ধান পচে গ্যাজ আসছে। এগুলো কোন কাজে আসবে না। দুইদিন যাবত রোদ উঠলেও কিছু কিছু কৃষক উঁচু জায়গায় ধান নিয়ে রোদে শুকাচ্ছে অধিকাংশ ধান থেকে পচা গন্ধ আসছে। কোন কোন জায়গায় পানি কিছুটা সরে যাওয়ার পর যেসকল জমি পানির উপর ভাসছে, ওই সকল জমি দেশীয় শ্রমিকদের দিয়ে প্রতি একর ২০ হাজার টাকায় কাটছে । পানির নিচ থেকে ধান কেটে নৌকায় তুলে নিজ নিজ খলায় অথবা সড়কে শুকনো জায়গায় নিয়ে আসছে। অধিকাংশ কৃষক বলছে এই ধান এনে কোন লাভ নেই। সারাবছর কষ্ট করে ফসল ফলানো হয়েছে বলে মনের তৃপ্তির জন্য নিয়ে আসি । কারন শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। বর্গা চাষি কৃষকরা আরো বেকায়দায় রয়েছেন। অনেকেই জমির আশা ছেড়ে দিয়েছেন।যেসকল কৃষক মহাজনের ঋন এনে জমি চাষ করেছেন তারা এখন দিশেহারা। পেটের খাবার যোগানোয় মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋন শোধ করবে কই থেকে। অন্যদিকে হাওরের কৃষকের গো- খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এসকল পচা ধানের খের গরু ,মহিষ খাচ্ছে না। হাওরের পতিত জমিতে পানি উঠে পড়েছে। গরু মহিষ ঘাস খাওয়ার কোন জায়গা নেই। বড় হাওরে অস্থায়ী কৃষকদের ছোট ছোট ঘর ধানের মাচা পানিতে ভাসছে। অন্যদিকে তাদের গরু মহিষ নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছে । সামনে কোরবানি ঈদ । অনেক কৃষকেই গরু বিক্রি করে মহাজনের ঋন ও সমিতির ঋন শোধ করবেন বলে কৃষকরা জানান। মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু জানান, মিঠামইন উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ৮ শত কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন । ধান কাটা হয়েছে ৭৫ % কিন্তু কৃষকের তথ্যের সাথে সরকারি তথ্যের কিছু অমিল রয়েছে। কৃষকদের দাবি এখনো ৪০ ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ১০ % কাটা ধানে গ্যাজ এসে চারা গজিয়েছে। হাওরে কৃষকরা জানান, আর যদি বৃষ্টি না হয় পানি কমতে শুরু করলে এখনো অনেক জমি কেটে ধান নেওয়া যাবে।