নিকলীতে নতুন বাজার মাছের আড়তে প্রতিদিন বেচাকেনা হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওরের মিঠাপানির মাছের সুখ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। কিশোরগঞ্জসহ নেত্রকোনা আর সুনামগঞ্জ হাওরের কিছু অংশের মাছ বেচাকেনা হয় কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার নতুন বাজার এলাকার মাছ বাজারে। দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন মাছ কিনতে। প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয় এখানে।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার নতুন বাজার এলাকার মাছ বাজারের ঐতিহ্য রয়েছে দীর্ঘদিনের। ভোর থেকে জেলেরা বোয়াল, আইড়, চিতল, রুই, কাতলা, বাইন, কালবাউশ, পাবদা, কই, মাগুর, শিং, চিংড়ি, রিটা, গোলশা, শোল, কাচকি, টাকি. পুটিসহ অন্তত অর্ধশত দেশীয় প্রজাতির মাছ এ বাজারে নিয়ে আসেন। সকাল ৫ টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে প্রতিযোগিতামূলক দরদামে বেচাকেনা।জেলে থেকে শুরু করে ফিশারির মালিকদের কাছ থেকে মাছ কেনে পাইকাররা। এরপর সেগুলো চলে যায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ বাজারে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে নিকলী নতুন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্ট্রগ্রাম উপজেলা এবং সুনামগঞ্জের দিরাই ও নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার বিভিন্ন হাওর থেকে আসা বেশ কিছু জেলের নৌকার ভীড় ছিলো তখন ঘোড়াউত্রা নদীর তীরঘেষা ঘাটে। নৌকা থেকে মৎসজীবীরা বাঁশের ও প্লাস্টিকের খাচায় কেউ মাথায় আবার দুইজনে মিলে টেনে ওপরে নিয়ে আসছেন মাছ। সেই মাছ অনেকে নৌকায় আবার অনেক নারী-পুরুষ ঘাট পাড়ে ছট বিছিয়ে ছোট বড় মাছ আলাদা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী চিৎকার করে মাছের দাম হাঁকছেন। একজন এদিকে ডাক হাঁকছেন তো অপরদিকে আরেকজন। চারদিক থেকে তাদের ঘিরে আছে অসংখ্য মানুষ।মাছ ছাড়া যেন অন্য কোনোদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই কারও। একজনের মাছ বিক্রি শেষ না হতেই আরেকজনের মাছ এসে হাজির। আবার শুরু হয় নতুন হাঁক ডাক। এরকম আট দশজন পাইকার বিরামহীনভাবে ডাক হেঁকে যাচ্ছেন আর স্থানীয় ও বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ক্রেতারা সুবিধা মতো মাছ কিনছেন।
কয়েকজন আড়ৎদার, ক্রেতা ও সাধারণ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,বর্তমানে শুকনো মৌসুম হওয়ায় নতুন বাজার এলাকার মাছের বাজারে এখন একটু মাছের সমাগম কম তবে আসছে বর্ষায় এ বাজার জমজমাট হবে। প্রতিদিন ঐতিহ্যবাহী এ বাজারে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চল নিকলী ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামসহ পাশের সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার কয়েকটি হাওর থেকে শত শত ক্রেতা ও বিক্রেতার সমাগম ঘটে।
মাছ বিক্রি করতে আসা জেলে নজরুল বলেন, হাওরের মিঠা পানির নানান জাতের মাছ জালে ধরা পড়ছে এবার। ছোট মাছের মধ্যে রয়েছে টেংরা, বাইন, মেনি, টাকি, কাইক্কা, পুঁটি, চিংড়ি ও চাপিলামাছ। বড় মাছের মধ্যে ধরা পড়ছে বোয়াল, কার্প, মৃগেল, বাউশ,আইর ও শোলমাছ। এ ছাড়া শিং মাছ ও মাঝেমধ্যে ধরা পড়ে জালে। তবে ছোট মাছের দাম ও চাহিদা অন্য মাছের চেয়ে একটু বেশি।
এ বাজারে আইড় ৬০০ টাকা, বোয়াল ৭৫০, গুলশা ৪০০, ট্যাংরা ৩৫০, চিংড়ি ৬০০, চিতল মাছ ৮০০, রুই ৩৫০, কাতলা ৫০০, বাইন ৫০০, পাবদা ৬৫০, কই ৩৫০, মাগুর ৪৫০, শিং ৫০০, শৌল ৪৫০, চাপিলা ২০০, চান্দা ১০০ ও টাকি ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
হাওর থেকে মাছ নিয়ে আসা জেলে এলিম মিয়া জানান,সারা রাত হাওরে মাছ ধরে নৌকা নিয়ে আমার ঘাটে আসি। সেখান থেকে মাছ নিয়ে আমরা নতুন বাজারে আসি।শুকনা মৌসুম হওয়ায় এখন মাছের দাম অনেক বেশি।
হাওর থেকে মাছ নিয়ে আসা ব্যবসায়ী হোসেন মিয়া জানান,বিল থেকে মাছ ধরে আমরা নতুন বাজারে নিয়ে আসি।ভোর ৬টা থেকে আমার মাছ এই বাজারে নিয়ে আসি। আমার মাছ আড়তে দেই। এই আড়তে অনেক পাইকার আসে। আড়তদাররা পাইকারি মাছ বিক্রি করে।বাজারে ন্যায্যমূল্যে মাছ আমরা বিক্রি করতে পারি। এই জন্য আমারা এই বাজারে মাছ নিয়ে আসি।
নিকলী নতুন বাজার মৎস্য আড়ৎদার আলমগীর হোসেন জানান, কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী সহ বিভিন্ন হাওর থেকে প্রতিদিন প্রচুর মাছ এ বাজারে আসে। বাজারের অন্তত ১৭ টি আড়তে প্রতিদিন অন্তত অর্ধকোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর মাছ ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় তারা পাঠাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, জেলেসহ ব্যবসায়ীরাও মাছের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।সারা বছর এখানে মাছ বেচাকেনা হয়।এ মাছের বাজার থেকে অসংখ্য মানুষের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা হচ্ছে। তাই ঐতিহ্যবাহী এ মাছ বাজারটি টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
নিকলী নতুন বাজার মৎস্য আড়ৎদার মো:লালন ফকির বলেন, আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী নিকলী নতুন বাজার।দীর্ঘ বছর ধরে এই বাজারে অনেক দূরদূরান্ত থেকে মাছ আসে।নিকলী,ইটনা, মিঠামইনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বাদুপানির মাছ আসে।এখানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধ কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি হয়।
কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রতিবছর মাছের চাহিদা রয়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টন। আর উৎপাদন হয় ৮২ হাজার মেট্রিক টন। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর প্রায় ২৮ থেকে ৩০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি করা যায়।
তিনি আরো জানান, জেলে ও মৎস্য চাষিদের আধুনিক পদ্ধিতিতে মাছ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যাতে করে তারা মাছ ফ্রিজিং করে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন।