নি:স্বার্থ ভালোবাসার আরেক নাম "মা"
মা—একটি ছোট্ট শব্দ, অথচ এর গভীরতা আকাশের চেয়েও বিশাল। পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াময় মুখ মায়ের। “মা” শব্দটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সীমাহীন ত্যাগ আর অনন্ত মমতার এক অপার্থিব অনুভূতি। জন্মের পর পৃথিবীর আলো দেখেই মানুষ প্রথম যে স্পর্শ অনুভব করে, সেটি মায়ের। সেই স্পর্শেই জেগে ওঠে ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর জীবনের প্রথম আশ্রয়ের অনুভূতি।
পৃথিবীর সভ্যতার উত্থান-পতনের যত গল্পই বলা হোক না কেন, মায়ের জন্য ভালোবাসার গল্পটি সব সময় একই রকম মমতায় মাখা থাকবে। কারণ মা এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সব কষ্ট আড়াল করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে চান। সন্তানের সামান্য ব্যথাতেও যার বুক কেঁপে ওঠে, তিনিই মা। পৃথিবীর মানুষ ভুল বুঝতে পারে, দূরে সরে যেতে পারে, কিন্তু মা কখনো সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা কমিয়ে দেন না। সন্তানের সফলতায় তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান, আর সন্তানের কষ্টে নীরবে চোখের জল ফেলেন।
মায়ের আঁচলের নিচেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। জীবনের হাজারো ক্লান্তি শেষে “মা” বলে ডাক দিলে হৃদয়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মায়ের হাতের স্পর্শ যেন সব দুঃখ ভুলিয়ে দেওয়ার এক জাদু। সন্তানের জন্য নিজের সুখ, স্বপ্ন, ইচ্ছা—সবকিছু ত্যাগ করতেও মা কখনো দ্বিধা করেন না।
আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে মানুষ অনেক কিছু পেলেও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে দূরত্ব কমলেও হৃদয়ের দূরত্ব যেন বাড়ছে। অনেক সন্তানই কর্মব্যস্ততার অজুহাতে মায়ের পাশে সময় দিতে পারে না। অথচ মা দামি উপহার চান না; তিনি চান সন্তানের একটু সময়, একটু খোঁজ নেওয়া, একটু ভালোবাসা। দিনের শেষে মায়ের মুখের একটি হাসিই সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে মা দিবস পালন করা হয় মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মায়ের সম্মানার্থে বিশেষ দিন পালনের প্রচলন ছিল। আধুনিক মা দিবসের ধারণা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে সত্যি বলতে, মাকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট দিনক্ষণের প্রয়োজন নেই। সন্তানের জীবনের প্রতিটি দিনই হওয়া উচিত মা দিবস।
ইসলামের দৃষ্টিতেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত মহান। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বহুবার মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে মায়ের কষ্ট, ত্যাগ ও সন্তানের জন্য তার সীমাহীন ভালোবাসার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন মা গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তানকে বড় করে তোলা পর্যন্ত অসীম কষ্ট সহ্য করেন। তাই ইসলামে মায়ের মর্যাদা এতটাই উঁচু যে মহানবী হযরত বলেছেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।”
ইসলাম শুধু মাকে ভালোবাসার কথাই বলেনি, বরং মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। মায়ের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলা, তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়া, তার অসুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো এবং কখনো তাকে অবহেলা না করা প্রতিটি সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তার সেবা করা শুধু মানবিক কর্তব্য নয়, এটি ইবাদতেরও অংশ। একজন সন্তানের সফলতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার মা সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
মায়ের দোয়া সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। পৃথিবীর অনেক দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও মায়ের দোয়ার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। সন্তানের সামান্য সুখের জন্যও মা মহান আল্লাহর কাছে অশ্রুসিক্ত চোখে দোয়া করেন। তাই মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, তার সম্মান রক্ষা করা এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাকে ভালোবাসা প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব।
মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়—মা মানে আশ্রয়, মা মানে সাহস, মা মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আরেক নাম। পৃথিবীতে যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আবেগ একইভাবে অমলিন হয়ে থাকবে। কারণ পৃথিবীর সব ভালোবাসার শুরু আর শেষ—একজন “মা”-কে ঘিরেই।
আজিজুর রহমান শান্ত
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।