দুই বছরেও ঘরে ফেরা হয়নি: জামিনে মুক্ত ছয় আসামি পরিবারের বাড়িছাড়া জীবনের আর্তনাদ
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
“মরার আগে স্বামীর ভিটেতে ফিরতে চাই। নিজের ঘরেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে চাই।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ফেকামারা (নয়া পাড়া) গ্রামের এক বৃদ্ধা নারী। শনিবার (৬ জুন) বিকেলে কটিয়াদী পৌরসভার একটি বাসায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪ সালের শেষের দিকে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হওয়া ছয় আসামি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, প্রায় দুই বছর ধরে তারা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। তাদের দাবি, ঘটনার পর তাদের বসতঘর ভাঙচুর করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে, এমনকি অনেক ঘরের ইট পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তাদের অভিযোগের তীর স্থানীয় বাচ্চু ও মাহফুজ গংয়ের দিকে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত পরিবারগুলোর সদস্যরা বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর তাদের বাড়িঘর, নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, আসবাবপত্র, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং মাছের ঘেরের মাছ পর্যন্ত লুটপাট করা হয়। বর্তমানে তাদের অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রিত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মামলার আসামি সবুজ অভিযোগ করেন, “জেল খেটেছি, আদালত আমাদের জামিন দিয়েছেন। কিন্তু জামিনে মুক্ত হওয়ার পরও নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছি না। প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, জনপ্রতিনিধিদের কাছে গিয়েছি, তবুও নিরাপদে বসবাসের সুযোগ পাইনি।”
তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া টিন দিয়ে ঘর নির্মাণের চেষ্টা করা হলে বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে নির্মাণাধীন ঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।
পরিবারগুলোর সদস্যদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া থাকার কারণে শিশুদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। বয়স্ক নারী-পুরুষরা চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের দাবি, বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি সামাজিকভাবেও তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে বলা হচ্ছে তারা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। তবে তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমাদের যদি এত শক্তি থাকত, তাহলে আমরা মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকতাম না। প্রশাসনের কাছে ঘরে ফিরতে সহযোগিতা চাইতে হতো না।”
তারা বলেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটি আদালত নির্ধারণ করবেন। জামিন পাওয়া একজন অভিযুক্তের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার। কিন্তু জামিনে মুক্ত হওয়ার পরও যদি কেউ নিজ বাড়িতে ফিরতে না পারেন, তাহলে বিষয়টি প্রশাসনের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজ ভিটায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ, ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা এবং তাদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।