একটি সেতুর অভাবে নিকলীর দুর্গম ভাটি অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের চরম ভোগান্তি
আল-আমিন হাসান, নিকলী:
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দুর্গম ভাটি অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে ধুবাচুড়া নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। দামপাড়া ইউনিয়নের ১নং আলিয়াপাড়া গ্রামের পশ্চিম পাশে অবস্থিত এই নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হলে কারপাশা গ্রামের আব্দুল হামিদ সড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মিত হলে একদিকে নিকলী ও দামপাড়া উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে, অন্যদিকে আলিয়াপাড়া ও সিংপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ ভাটি অঞ্চলের মানুষ সহজেই কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে যাতায়াত করতে পারবেন। এতে করে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট কাটিয়ে উঠে এলাকাটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ওই এলাকায় একটি অস্থায়ী সড়ক থাকলেও তা বর্ষা মৌসুমে সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে বছরের প্রায় ছয় মাস এলাকাবাসীকে নৌকার ওপর নির্ভর করে চলাচল করতে হয়। এতে করে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বিশেষ করে বর্ষাকালে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারে না। অনেক সময় নৌকা না পেয়ে দিনের পর দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে ব্যর্থ হয় তারা। একইভাবে কৃষকরা উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে না পেরে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এলাকাবাসী জানান, জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীদের নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। নদী পারাপারের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়, যা অনেক সময় রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আলিয়াপাড়া গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, “বর্ষা এলেই আমাদের জীবন থমকে যায়। কোনো রোগী অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে করতে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরের প্রায় অর্ধেক সময় নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিনের যাতায়াতে সময় ও খরচ দুই-ই বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা নিয়মিত পণ্য আনা-নেওয়া করতে না পারায় ব্যবসা কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে।
কারপাশা এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, “রাস্তা না থাকায় আমরা ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারি না। পণ্য পরিবহন করতে অনেক সময় লাগে এবং খরচও বেশি হয়। একটা ব্রিজ হলে আমাদের ব্যবসা অনেক সহজ হয়ে যাবে।”
এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সঠিক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। এতে করে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এলাকাবাসীর একটাই দাবি—অস্থায়ী বা মৌসুমি রাস্তা নয়, বরং বছরজুড়ে চলাচলের উপযোগী একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ। তাদের মতে, এই এলাকায় বছরে প্রায় ছয় মাস পানি থাকে এবং বাকি সময় শুকনো থাকে, তাই একটি টেকসই অবকাঠামোই একমাত্র কার্যকর সমাধান হতে পারে।
একাধিক বাসিন্দা বলেন, “আমরা ছয় মাসের জন্য কোনো রাস্তা চাই না, আমরা ১২ মাসের স্থায়ী ব্যবস্থা চাই। একটি সেতু হলে আমাদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ধুবাচুড়া নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তাদের বিশ্বাস, একটি সেতুই বদলে দিতে পারে এই ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনমান এবং দূর করতে পারে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।