বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ

সুন্দরবনে ফের দস্যু আতঙ্ক: ২২ জেলে অপহরণে উপকূলে কান্না, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

Admin ১৫ May ২০২৬ · Friday · ০৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরবনে ফের দস্যু আতঙ্ক: ২২ জেলে অপহরণে উপকূলে কান্না, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সুন্দরবনে ফের দস্যু আতঙ্ক: ২২ জেলে অপহরণে উপকূলে কান্না, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

মো: আল-মাহফুজ শাওন 

সুন্দরবনের বুক আজ আবারও ভারী হয়ে আছে নিরীহ মানুষের কান্নায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা নদীতে নামে পরিবারের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে, সেই জেলেরাই এখন দস্যুদের হাতে বন্দি। সম্প্রতি সুন্দরবনের নদী ও খাল এলাকায় ২২ জন জেলেকে অপহরণের ঘটনায় পুরো উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও গভীর অনিশ্চয়তা।

অপহৃত জেলেদের পরিবারগুলোর ঘরে এখন চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। অনেক পরিবারের চুলা জ্বলছে না দিনের পর দিন। সন্তানদের চোখে ঘুম নেই, মায়েদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে জনপদ। উপকূলের মানুষের প্রশ্ন—স্বাধীন দেশে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের কি কোনো নিরাপত্তা নেই?

২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বহু দস্যু আত্মসমর্পণ করে এবং বনাঞ্চলে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই স্বস্তি যেন আবারও ভেঙে পড়ছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নতুন ও পুরোনো দস্যু বাহিনীগুলোর তৎপরতা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে সুন্দরবনে প্রায় ১৬টি ছোট-বড় দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী ও আসাবুর গ্রুপের নাম বেশি আলোচনায় এসেছে।

দস্যুরা গভীর বনাঞ্চল ও নদীপথকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। সুযোগ বুঝে জেলেদের নৌকা ও ট্রলার থামিয়ে অপহরণ করা হচ্ছে। পরে তাদের মুক্তির জন্য দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিপণ দিতে না পারলে নির্যাতনেরও শিকার হতে হচ্ছে জেলেদের।

দস্যুদের ভয় এখন শুধু জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন সময়ে পর্যটকবাহী ট্রলার কিংবা রিসোর্টে ডাকাতির চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। ফলে পর্যটকদের মাঝেও বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুন্দরবনে যদি দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান জোরদার করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৬১ জন দস্যুকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও দেশীয় অস্ত্র।

তবে উপকূলের মানুষ এখন শুধু আশ্বাস শুনতে চায় না। তারা চায় কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান। অপহৃত ২২ জেলেকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার এবং দস্যু বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার জেলে মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। নদীতে না গেলে অনাহারে থাকতে হয়। কিন্তু এখন নদীতে গেলেও ভয়—ফিরে আসতে পারবো তো? আমাদের পাড়া দিয়ে হাঁটলে শুনতে পাই, কোন না কোন লোককে ডাকাতরা তুলে নিয়ে গেছে।”

দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার অরিবিন্দু মন্ডল বলেন, “সাহস নিয়ে গোছগাছ করি বনে যাব বলে। কিন্তু আবার ভয় হয়, ডাকাত যদি ধরে। তাহলে টাকা পাব কোথায়? বন বিভাগ টাকা নিয়ে পাস-পারমিট দেয়, কিন্তু ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা করে না। বাঘ, সাপ আর কুমিরের হাত থেকে বাঁচার জন্য মাদুলি বা তাবিজ নিয়ে বনে যাই। কিন্তু ডাকাত থেকে বাঁচার কোনো তাবিজ নেই।”

উপকূলীয় জেলেরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়; বরং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় এবং নদীপথে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুললেই দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি উপকূলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। সেই সুন্দরবন যদি দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে তা শুধু উপকূলের মানুষের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই অশনিসংকেত।”

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, “আমরা শুনতে পাই ডাকাত জেলেদের তুলে নিচ্ছে। কিন্তু থানায় কোনো অভিযোগ না করায় প্রশাসনের ব্যবস্থা নিতে সমস্যা হয়। সেজন্য জেলেদেরও প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে।”

এদিকে, ‘বিপদমুক্ত নৌযাত্রা, জানমালের সুরক্ষা’ প্রত্যয়ে দেশে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ। নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের আয়োজনে চলমান এই কর্মসূচিকে ঘিরে উপকূলবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সপ্তাহব্যাপী এ আয়োজন সুন্দরবনকে কতটা দস্যুমুক্ত করতে সক্ষম হবে?

উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে সুন্দরবনে আবারও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক, যাতে জীবিকার সন্ধানে নদীতে নামা মানুষগুলো অন্তত জীবিত ফিরে আসার নিশ্চয়তা পায়।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ