বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ

বনবিভাগের আপত্তির মাঝেও সংরক্ষিত বনে সুউচ্চ বাউন্ডারী নির্মাণ; হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

Admin ১৯ June ২০২৬ · Friday · ০২:২৯ অপরাহ্ণ
বনবিভাগের আপত্তির মাঝেও সংরক্ষিত বনে সুউচ্চ বাউন্ডারী নির্মাণ; হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য
বনবিভাগের আপত্তির মাঝেও সংরক্ষিত বনে সুউচ্চ বাউন্ডারী নির্মাণ অব্যাহত; হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

মোহাম্মদ হোসাইন, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বিশাল আয়তনজুড়ে নির্মিত হচ্ছে সুউচ্চ বাউন্ডারী। বনবিভাগের আপত্তির মাঝেও বনাঞ্চলে বিশাল আয়তনের এই বাউন্ডারী নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে বলে জানাগেছে। সরেজমিনে পরিদর্শন দেখা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপাড়া শালবাগানস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সেগুন বাগান এলাকায় নির্মিত হচ্ছে সুউচ্চ এই বাউন্ডারী। যদিও এনজিও সংস্থা এবং তদারকের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যাক্তির পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে বনবিভাগের অনুমতি নিয়েই বনাঞ্চলের সুউচ্চ এই দেওয়ালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) অফিস সুত্র জানিয়েছেন, বনাঞ্চলের দেওয়াল নির্মাণের জন্য বনবিভাগ থেকে কোন ধরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে বনাঞ্চলে সুউচ্চ ও লম্বা দেওয়াল নির্মাণের খবর পেয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার তরফ থেকে কাজটি না করার জন্য কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) নিকট লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বনবিভাগের নিদের্শনাকে অমান্য করে বাস্তবায়নকারী এনজিও সংস্থা অনবরত কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানাগেছে। ডিএফও অফিস জানায়, বনাঞ্চলে বাউন্ডারী নির্মাণ না করতে গেল ঈদুল আজাহার আগে (২৬মে) বিভাগীয় বন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠি আরআরআরসি অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে।  
বনবিভাগ সুত্র জানায়, ২৬নং ক্যাম্পের পিছনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রয়েছে হাতির চলাচলের করিডোর। ওই করিডোর দিয়ে হাতি নিয়মিত চলাচল করেন। পাহাড় পরিবেষ্টিত পাদদেশে হাতি চলাচলের করিডোরজুড়ে বাউন্ডারীটি নির্মিত হচ্ছে। এতে পুরো করিডোরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ওই করিডোর দিয়ে হাতি চলাচলের পথ একেবারেই রুদ্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া টেকনাফ বনাঞ্চলের ওই এলাকায় ২৭০প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য স্থান। পাহাড়ের ওই এলাকাজুড়ে প্রাকৃতিগত ভাবে পশুপাখির খাদ্যের উৎপাদনস্থল। দেখা গেছে, বনের মাঝে দেওয়াল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে। এখনো পলেস্তার তথা ফিনিশিংয়ের কাজ বাকী রয়েছে। পাহাড় পরিবেষ্টিত বিশাল আয়তনজুড়ে সুউচ্চ দেওয়ালটি নির্মিত হওয়ায় হাতি চলাচলের করিডোর যেমন বন্ধ হয়ে পড়বে। তেমনি জীব বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। বন বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, বন ও বন্যপ্রাণী অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।  
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ২৬নং শালবাগান ক্যাম্পের প্রান্ত সীমানায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতের নির্মিতব্য সুউচ্চ এই বাউন্ডারী। সংশ্লিষ্ট সুত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে নির্মিতব্য বাউন্ডারীর উচ্চতা ৫মিটার ও দৈর্ঘ্য প্রায় ১শ ৩৭মিটার। নির্মাণ কাজ তদারকে নিয়োজিত মুখতার নামীয় এক প্রতিনিধি জানান, বিশ^ব্যাংকের অর্থায়ানে ইউএনডিপি সরাসরি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন। ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এটি করা হচ্ছে বলে ওই প্রতিনিধি জানিয়েছেন। 
তবে স্থানীয়দের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বনের ভেতরে এত বিশাল এলাকাজুড়ে সুউচ্চ বাউন্ডারী নির্মাণ হলে জীব বৈচিত্র্যের যেমন ক্ষতিতে পড়বে। তেমনি ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্যও দূর ভবিষ্যতে এটি অন্যতম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে ওই বাউন্ডারীকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকা অপরাধজোন হিসেবে গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
বনবিভাগ সুত্র জানায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের শালবাগান ও ন্যাচারপার্ক এলাকাস্থ সংরক্ষিত বনে প্রায় ২শ ৭০প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। বনাঞ্চনের গহীনে তাদের বিচরণ স্বাভাবিক বিচরণ থাকলেও। বনে রোহিঙ্গাদের বিচরণ ও তাদের আবাসস্থল নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণী গহীন বনে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছেন। তবে অনেক বন্যপ্রাণী অন্যত্রে চলে গেছেন। অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে। বন ও বনপ্রাণী গবেষকদের মতে,সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লেদা থেকে শালবাগান ও ন্যাচারপার্ক বন পশু পাখির অভয়ারণ্য। উল্লেখিত বনাঞ্চল পশু পাখির খাদ্যস্থল। রোহিঙ্গাদের চলাচলের কারণে পশু-পাখি এখন বনের গহীনে চলে গেলেও তাদের বিচরণ রয়েছে টেকনাফ গেম রিজার্ভের ওই সব এলাকায়।    
টেকনাফ রেঞ্জের আওতাধীন বনপাহারা দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের ওই এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির বানর, শিয়াল, ভাল্লুক, বন মোরগ, হাতি, সরীসৃপ প্রাণীসহ বন্যপ্রাণীর বিচরণ এখনো এখনো চোখে পড়ে। রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসস্থল তৈরীর কারণে বন্যপ্রাণীর জন্য বনের কাছাকাছি জীববৈচিত্র্যময় জায়গা এখন বন্যপ্রাণীর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। তাই তারা গহীন বনে নিজেদের ঠিকানা করে নিয়েছেন। এতেও এদিকে খাদ্য সংকট। অন্যদিকে বিপন্ন আবাসস্থল। এতেই মহাসংকটাপন্নে টেকনাফের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী।
তার মাঝে মুচনী বিটের শালবাগানের ওপারে বনের মাঝে সুউচ্চ ও বিশাল আয়তনের বাউন্ডারী নির্মিত হলে ২শ ৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর চলাচল হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া বনাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে উঠলে বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন। তেমনি বনের গাছ-গাছালি এবং বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। 
বন্যপ্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থাপনা বা কোন ধরণের কিছু করতে হলে সবার আগে অবশ্যই “এনভাইরেন্টমেন্ট ইমপেক্ট এসেসম্যান্ট” তথা ইআইএ করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে যেন বন এবং বন্যপ্রাণীর উপর যেন কোন প্রভাব না পড়ে।    
এদিকে ২৬নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জানান, আসলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কোন হাত নেই। যদ্দুর জানি, আরআরআরসির মাধ্যমে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন।  
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা-ডিএফও (কক্সবাজার দক্ষিণ) মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতি চলাচলের করিডোরে বিশাল আয়তনজুড়ে সুউচ্চ ওয়াল নির্মিত হওয়ার বিষয়টি অবগত হওয়ার পর পরই কাজটি বন্ধ রাখতে তিনি আরআরআরসি তথা কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও পুনবাসন কমিশনারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি বনের মাঝে বিশাল আয়তনজুড়ে ওয়াল নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে আবারো শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার বরাবর চিঠি লিখবেন বলে জানিয়েছেন। জানতে চাইলে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লক্ষ লক্ষ লোকের সৃষ্ট বর্জ্য; সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে পরিবেশ দূষিত হবে। আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বনের মধ্যে ওয়াল করাটা খারাপ; অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করাটা আরো খারাপ। সর্বোপুরি পরিবেশ সংরক্ষণের তাগিদেই কাজটি করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। পরিবেশবাদী সংগঠনসহ স্থানীয় সচেতন মহল বন ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা এবং হাতি চলাচলের করিডোর বন্ধ না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ