বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

অনলাইন ডেস্ক ২০ June ২০২৬ · Saturday · ০৭:৫৮ অপরাহ্ণ
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

 

একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দের বাংলা সংবাদ বিভাগের প্রধান, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দুই মেয়াদের সাবেক মহাপরিচালক, প্রবীণ সাংবাদিক ও সুলেখক, বৃহত্তর পাবনার কৃতীসন্তান কামাল লোহানীর (১৯৩৪-২০২০) আজ ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের আজকের এই দিনে সকাল দশটার দিকে ঢাকার মহাখালীস্থ শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে - সাগর লোহানী, দুই মেয়ে -  বন্যা লোহানী ও ঊর্মী লোহানীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আমিন।

কামাল লোহানী ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সোনতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কামাল লোহানী নামে সমধিক পরিচিত হলেও পারিবারিক নাম তাঁর আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। পিতা আবু নঈম মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী ও মাতা রোকেয়া লোহানী।

মাত্র সাত বছর বয়সে কামাল লোহানী তাঁর মাকে হারান। নিজগ্রামের প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে কলকাতা মডার্ন হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি নিঃসন্তান ফুপু সালেমা খানমের আশ্রয়ে থাকেন। দেশবিভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি পাবনা জিলা স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং থাকেন ছোটো চাচা শিক্ষাবিদ ও লেখক তাসাদ্দুক হোসেন খান লোহানীর বাসায়। ১৯৫২ সাল মাধ্যমিক পরীক্ষার বছর। ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি রক্ত ফিনকি দিয়ে যখন পাবনা পৌঁছালেন, তখন বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর আর দাঙ্গা দেখা তারুণ্য উদ্দীপ্ত কিশোর ছুটে বেরিয়ে এলেন, কণ্ঠ উচ্চকিত করলেন মিছিলে, হত্যার প্রতিবাদে। রাজনীতিতে দীক্ষা নিলেন তিনি ওই বাহান্নর ২১, ২২ আর ২৩ ফেব্রুয়ারির রক্তধোয়া দিনগুলোর সংঘাতে। ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। এ কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে আন্দোলনে যোগদান এবং বারবার কারাবরণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন এখানেই।

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কলেজ সংসদ নির্বাচন এগিয়ে এলে তাঁরা ক’জন সমমনা একজোট হয়ে বাঁধলেন জোট ‘পাইওনিয়ার্স ফ্রন্ট’ অর্থাৎ ‘প্রগতিবাদী ছাত্র জোট’। লড়লেন নির্বাচনে এবং নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেন। তিনি নির্বাচিত হলেন সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে থাকলেন তিনি। উপস্থাপনা, গ্রন্থনা এবং আবৃত্তিতে পাঠ নিলেন।

১৯৫৩ সালে পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ পার্কে (বর্তমানে শহিদ অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখানে যোগদানের জন্য আসেন তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খুনি নূরুল আমিন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সরদার আবদুর রব নিশতার, কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতা আবদুল কাইয়ুম খান, প্রাদেশিক লীগ নেতা মোহাম্মদ আফজাল প্রমুখ। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যাকারী নূরুল আমিনের পাবনা আগমন ও মুসলিম লীগ সম্মেলনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করায় কামাল লোহানী পাবনার রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন।

১৯৫৪ সালের মার্চে পূর্ব বাংলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক নির্বাচন। কামাল লোহানী তথা সব প্রগতিশীল ছাত্ররাই যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাবনা টাউন হলে মহান শহিদ দিবস উপলক্ষে গণজমায়েত এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিপুল জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুসলিম লীগ সরকার তটস্থ হয়ে পরদিন গ্রেফতার শুরু করে। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে কামাল লোহানী গ্রেফতার হন এবং যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ে নির্বাচনের পর মুক্তিলাভ করেন। কিন্তু মার্কিনী মদদপুষ্ট পাকিস্তান সরকার এ বিজয়কে গ্রহণ করেনি। এবং শঙ্কিত হয়ে ১৯৫৪ সালের ২৯ মে ৯২ (ক) ধারার মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় ‘গভর্নরি শাসন’ চালু করে। মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা পূর্ব বাংলায় গভর্নর হয়ে আসেন এবং ব্যাপক ধরপাকড়ের নির্দেশ দেন।

কলেজ ছুটি থাকায় কামাল লোহানী গ্রামের বাড়ি চলে যান। এ সময় সোনতলা গ্রাম থেকে ৩০ মে পুনরায় তাঁকে গ্রেফতার করে উল্লাপাড়া থানা হাজতে দিনভর রেখে রাতে তাঁকে পুলিশ পাহারায় পাবনা জেলা জেলে নিয়ে যায়। ঈদের দিন পাবনা জেলে ‘রাজবন্দী’ হিসেবে তিনি কারাজীবন শুরু করেন। এর কিছুদিন পর তাঁকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে রাজশাহী কারাগার থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেন পাবনায়। পারিবারিক চাপের মুখে তিনি চাচা তাসাদ্দুক হোসেন খান লোহানীর কাছ থেকে মাত্র ১৫ টাকা চেয়ে নিয়ে অনিশ্চিতের পথে ঢাকা অভিমুখে পা বাড়ালেন। জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন কামাল লোহানী। আর সেই সঙ্গে শুরু হলো তাঁর নিজের পায়ে দাঁড়াবার সংগ্রাম।

ঢাকায় এসে কামাল লোহানী তাঁর চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহযোগিতায় ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে মাসিক ৮০ টাকা বেতনে ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় সহ সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। হাতেখড়ি হলো তাঁর সাংবাদিকতায়। সেই থেকে তাঁর কলমের আঁচড়ে তৈরি হতে লাগলো এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

১৯৫৭ সালে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এ যোগ দেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে দেশ বিপন্ন হলে কামাল লোহানী আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। কিছুদিন পর গ্রেফতারির শঙ্কা কেটে গেলে আবার পত্রিকায় যোগ দেন এবং নৃত্যগুরু জিএ মান্নানের এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন এবং দৈনিক পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নৃত্য অধ্যায়। এ সময় বুলবুল একাডেমিতে জিএ মান্নান যখন ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ প্রযোজনা করলেন তখন ছেলে চরিত্রে অংশ নিলেন কামাল লোহানী। ১৯৫৯ সালে এ নৃত্যনাট্য নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ সফর করেন তিনি। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যান এবং ইরান ও ইরাক সফর করেন।

১৯৬০ সালে কামাল লোহানী বিয়ে করেন দীপ্তি লোহানীকে। সে সময় দীপ্তি লোহানী সমাজকল্যাণে মাস্টার্স করছিলেন। জীবিকার চাপ শুরু হলো। কামাল লোহানী বনেদি সংবাদপত্র ‘দৈনিক আজাদ’-এ যোগ দিলেন। 

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গর্জে ওঠে। কামাল লোহানীর নামে জারি হয় হুলিয়া। ১৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে পত্রিকা অফিস থেকে ঘরে ফেরার পথে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ২৬ নম্বর সেলে রাখে। এই সেলে সে সময় বন্দি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কফিল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, আবুল মনসুর আহমেদ, রণেশ দাশগুপ্ত, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। সাড়ে তিন মাস জেল খাটার পর তিনি মুক্তি লাভ করেন।

১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে যোগ দিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই শিফট ইনচার্জ পদে উন্নীত হন। ১৯৬৫ সালে ‘পাকিস্তান ফিচার সিন্ডিকেট’-এ এবং ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে কিছুদিনের জন্য ‘দৈনিক পয়গাম’-এ কাজ করেন। ১৯৬৯ সালের শেষ ভাগে কামাল লোহানী অবজারভার গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স-এর ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় শিফট ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেন। পরে চিফ সাব এডিটর পদে উন্নীত হন। সে সময় তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে দুই দফায় যুগ্ম সম্পাদক এবং ১৯৭০ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী ‘ছায়ানট’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় সাড়ে চার বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। নীতিগত কারণে ছায়ানট ছেড়ে মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি’। ১৯৬৭ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্বোধন হয় ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে। আয়োজন করেন গণসংগীতের অনুষ্ঠান ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমছে’। নাটক ‘আলোর পথযাত্রী’ পরিচালনা ও অভিনয় এবং নৃত্যুনাট্য ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে’ অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউনের পর যতদিন তিনি পূর্ব বাংলায় ছিলেন, ততদিন সামরিক শাসকচক্রের নানা দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে তৎপর ছিলেন। এ সময় তিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় কয়েকটি অগ্নিগর্ভ প্রতিবেদন রচনা করেন। অবশেষে এপ্রিলের শেষে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এছাড়া সাংস্কৃতিক-কর্মী ও সংগঠনগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংঘবদ্ধ করে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ গঠনে তৎপর ছিলেন। কিন্তু অবস্থার অবনতিতে অবশেষে কুমিল্লার চান্দিনা হয়ে নৌপথে ভারত সীমান্তে পৌঁছেন এবং ওই স্থানের থানা হাজতে নিরাপদে রাত কাটানোর পরেরদিন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা গিয়ে উপস্থিত হন। সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা যান। তিনি যখন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে উপস্থিত হন তখন ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের আয়োজন চলছিল। বালিগঞ্জের এ বাড়িতে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা বাস করতেন। এই ট্রান্সমিশনটির উদ্বোধনী অধিবেশনে কামাল লোহানী কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন।

কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বাংলা সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সংবাদ বিভাগ সংগঠন করা ছাড়াও সংবাদ পাঠ, কথিকা লেখা ও প্রচার, ঘোষণা, স্লোগান দেওয়া ইত্যাদিতে কণ্ঠ দিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাধীন বাংলা বেতারে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রথম বার্তাটি লিখেছিলেন কামাল লোহানী এবং বিশ্ববাসীর কাছে সেই বিজয়বার্তা পৌঁছেছিল তাঁর উচ্চারণে।

১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকার ঢাকা চলে আসবে, এজন্য কামাল লোহানী চলে এলেন ঢাকায় এবং সেদিনই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন তিনি।

কামাল লোহানী ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বেতারের দায়িত্ব নিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী ও আশফাকুর রহমান খান। দেশ স্বাধীন হলেও প্রশাসনে পরিবর্তন আসেনি বলে অনেকটা নীরব প্রতিবাদেই বেতারের ট্রান্সমিশন পরিচালক হিসেবে তিনি বেতার ত্যাগ করেন।

১৯৭৩ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি পুনরায় সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। যোগ দেন ‘দৈনিক আজাদ’ নামে একটি নতুন পত্রিকায়। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হন ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৪ সালে যোগ দেন ‘দৈনিক বঙ্গবার্তায়। তিন মাস পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকার তিনি বার্তা সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র অ্যানালমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে মাত্র ৪টি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয় সরকার। নির্মল সেন ও কামাল লোহানী বাকশালে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় চাকরিহারা কামাল লোহানী খুবই অর্থকষ্টে পড়েন। ১৯৭৭ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক নিযুক্ত করে ঢাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন তাঁকে। ১৯৭৮ সালে তাঁকে সম্পাদক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে ‘বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট-এর প্রকাশনা পরিচালক ও ‘ডেপথনিউজ বাংলাদেশ’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন পরে তিনি পিআইবি’র অ্যাসোসিয়েট এডিটর পদে নিযুক্ত হন।

কামাল লোহানী ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা গঠন করেন এবং এর সভাপতি হন। তিনি উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি ও সম্মিলিত জোটেরও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুই মেয়াদে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একুশে চেতনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকর্মী পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিটি ও বাংলাদেশ নাট্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আমৃত্যু।

কামাল লোহানী সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপামি ১৫টি বই লিখেছেন। তাঁর রচিত প্রথম গ্রন্থ ‘আমাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম’। শহিদ জননী জাহানার ইমামের স্মরণে রচিত ও প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে প্রকাশ করেছেন ‘আমরা হারবোনা’। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে লিখিত এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত লেখা নিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘সত্যি কথা বলতে কি’; ‘এদেশ আমার গর্ব’; ও ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহঙ্কার’।  তিনি বাংলাদেশের নৃত্যশিল্প প্রসঙ্গে রচনা করেছেন ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নৃত্যশিল্পের বিস্তার’। মহান মুক্তিযুদ্ধের মনস্তাত্তিক লড়াইয়ের হাতিয়ার বেতার প্রচার মাধ্যম নিয়ে তিনি রচনা করেছেন ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশ ও দেশান্তরে যে সব বরেণ্য রাজনৈতিক, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক লোকান্তরিত হয়েছেন তাঁদের ওপর রচিত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংকলন ‘যেন ভুলে না যাই’ এবং ‘তোমাদের ভুলবনা’। তিনি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক লেখালেখির গণ্ডি ছাড়িয়ে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন - ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং ‘শব্দের বিদ্রোহ’।

কামাল লোহানী রাজনীতি, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রেখে দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করেন। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখায় ২০১৫ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মাননা ‘একুশে পদক’, বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট-এর ‘মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা’ সহ অনেক পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ