বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
সারাদেশ

টেস্ট বাণিজ্যে সরকারি হাসপাতালে দালাল পুষছেন চিকিৎসকরা!

Admin ১২ April ২০২৬ · Sunday · ০৪:২০ পূর্বাহ্ণ
টেস্ট বাণিজ্যে সরকারি হাসপাতালে দালাল পুষছেন চিকিৎসকরা!
টেস্ট বাণিজ্যে সরকারি হাসপাতালে দালাল পুষছেন চিকিৎসকরা!

মোঃ শহিদুল ইসলাম, ময়মনসিংহ (গৌরীপুর) প্রতিনিধিঃ
প্রায় ২৮৬.১৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তন নিয়ে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা। এখানে বসবাসরত সাড়ে ৪ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সুলভ ও সহজে চিকিৎসা সেবা নিতে বেশিরভাগ রোগীই আসেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর বিপাকে পড়েন রোগ নির্ণয়ের নানা পরীক্ষায়। টেস্ট বাণিজ্য করে দালালদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে আসা গ্রামের সহজ-সরল রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে কর্মরত দুইজন সেকমো (উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার) গোলাম কিবরিয়া জাহিদ ও সোহেল রানা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে আঁতাত করে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কিংবা সাদা টোকেনে প্যাথলজি পরীক্ষায় লিখে দেন। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়া মাত্রই হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নেয় দালালরা। ব্যবস্থাপত্র দেখে ঠিক করে দেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম। সরলমনা রোগীদের বলা হয়, এ পরীক্ষা শুধু তাদের ডায়াগনস্টিকেই করা হয়।

এভাবেই ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগ ও ইমার্জেন্সি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এসব দেখেও না দেখার ভান করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। খোদ চিকিৎসকদের ছত্রছায়ায় এসব দালালচক্র সক্রিয়।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগী ধরতে ব্যস্ত প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন দালাল। সরকারি হাসপাতাল সংলগ্ন গড়ে ওঠা ৫ থেকে ৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে তারা কমিশনের বিনিময়ে কাজ করছেন। তার ভাগ পান চিকিৎসকরাও। সেবা নিতে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসেছে আরও অনেক অভিযোগ।

শনিবার (১১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেবা নিতে আসা রোগীর ব্যবস্থাপত্রের বিপরীত পৃষ্ঠায় লিখে দিয়েছেন মোবাইল নম্বর। চিকিৎসক রোগীকে বলে দিয়েছেন দুপুর ২টার পর ক্লিনিকে যোগাযোগ করার জন্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া নম্বরে কল দিলেই রোগী ভাগিয়ে নেওয়া হয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। শনিবার সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় ১০ থেকে ১৫ জন দালাল চক্রের সদস্য।

এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলায় নিরাপত্তা প্রহরী শাকিল আহমেদের সঙ্গে অসদাচরণ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার গোলাম কিবরিয়া জাহিদসহ কয়েকজন সেকমোর।

ভোক্তভোগী নিরাপত্তা প্রহরী শাকিল আহমেদ বলেন, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলায় 
উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার গোলাম কিবরিয়া জাহিদ আমার সঙ্গে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে লাঠি নিয়ে মারতে আসেন। দালাল চক্রের সঙ্গে টেস্ট বাণিজ্যে সেকমো জাহিদসহ কয়েকজন জড়িত আছেন। আমি চাই এই সিন্ডিকেট ভেঙে সাধারণ প্রকৃত সেবা পাক।

ভুক্তভোগীরা জানান, ক্লিনিক ও ডায়াগস্টিক সেন্টার চালাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তাররাই। ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের পাঠিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হচ্ছে কারণে-অকারণে। দিনশেষে পকেট ফাঁকা হলেও রোগের সঠিক তথ্য নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন না। নির্মূল হয় না রোগও।

স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নিজেই যখন অনিয়মে জড়ান, সেখানে দালালের দৌরাত্ম তো বাড়বেই।

উপজেলা জাটিয়া ইউনিয়ন থেকে এক স্বজন নিয়ে চিকিৎসার জন্য ঈশ্বরগঞ্জ হাসপাতালে আসেন আয়শা খাতুন। তিনি বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দালালরা সবসময় হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করেন। অনেক দালাল ডাক্তারের রুমেই বসে থাকেন। চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন দেওয়া মাত্রই তারা রীতিমতো হামলে পড়েন রোগীর ওপর। কাগজ নিয়ে তাদের নিজ নিজ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান পরীক্ষার জন্য। হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা।

উপজেলার মগটুলা ইউনিয়ন থেকে চর্মরোগে আক্রান্ত শিশুকন্যা তাসনিম জারাকে নিয়ে শনিবার হাসপাতালে আসেন তার মা ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, মেয়ের মুখে দানা দানা কি যেন হয়েছে। হাসপাতালে এলে ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছেন এবং ব্যবস্থাপত্রে একটা মোবাইল নম্বর লিখে দিয়েছেন। বলেছেন এই নম্বরে পরে কল দেওয়ার জন্য।

শনিবার (১১ এপ্রিল) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মুন্নী, মুহাম্মদ আলী ও মাইশাসহ কয়েকজন রোগী জানান, হাসপাতালে এলেই নানা পরীক্ষার ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে দালালরা আমাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিয়ে পরীক্ষা করেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষে হাসপাতালে সহজ ও সুলভমূল্যে চিকিৎসা নিতে। কিন্তু আমাদের হাতে কারণে-অকারণে পরীক্ষার নিরীক্ষার লম্বা কাগজ তুলে দেওয়া হয়। যা আমাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

টেস্ট বাণিজ্য করে হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষার জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার গোলাম কিবরিয়া জাহিদের নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে অপর এক উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সোহেল রানা এ বিষয়ে বলেন, আমার ওপর আনা অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমাদের কাজ রোগীদের সেবা দেওয়া, দালাল দূর করা না। দালালরা কীভাবে হাসপাতালের ভেতরে আসে?

এ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু বলেন, হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে বেচাকেনা ও দালালি টোটালি বন্ধ করে দেব। ইতোমধ্যে আমি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বলেছি কঠোর পদক্ষেপ নিতে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা নেব।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

জোরপূর্বক গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার,হয়রানিমূলক চাঁদাবাজির মামলা

জোরপূর্বক গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার,হয়রানিমূলক চাঁদাবাজির মামলা

জামাল উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার , কিশোরগঞ্জকিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের ভাস্করখিলা...

১৬ April ২০২৬ · Thursday · ০৬:৫২ পূর্বাহ্ণ